Take a fresh look at your lifestyle.

পিতার মুখচ্ছবি

272

তোমাকে দেখে দেখে আমি আমার বয়স গুনি বাবা,

তোমাকে দেখে দেখে আমি আমার ভবিষ্যত দেখি।
তোমার পাকা চুলের সিথানে চকচক করছে যে টাকের উঠোন,
ওখানটাতেও একদিন অনেক যত্ন করে তোমার মা তেল লাগিয়ে দিতেন।
যেমন এখন আমার ছেলের মাথায় তেল লাগিয়ে দেয় ওর মা।

জানো বাবা!
আমি তোমার চশমার পুরু গ্লাসের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে,
তোমার মন খারাপ পড়ি।
তোমার চোখে তাকিয়ে দেখি নিরন্তর দুলতে থাকা, তোমার প্রিয় অপেক্ষার দিনপঞ্জি।
আমি তোমার প্রতাপশালী যৌবনের স্মৃতিঘরে ঘুরে এসে,
ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি তোমার বার্ধক্যের অসহায় দিনরাতে।

জীবন কেন এমন হয় বাবা!
তোমার শক্ত সামর্থ কোমড়ের ভার,
কেমন একখানা লাঠির মেরুদণ্ডে আজ ধরিয়ে দিয়েছে তোমার জীবন!
তোমার পুরো ওষ্ঠযুগল দন্তহীন মুখের গহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে ভীষণ কাঁপছে।
সময় কেমন অসময়কে ধারণ করে মেনে মানিয়ে নিচ্ছে,
নিদারুণ নিয়তির আপাদমস্তক!

বাবা!
আমার প্রিয় বাবা!
তুমি একটু একটু করে সমর্পিত হচ্ছো মৃত্যুর নিয়তিতে,
আমি অসহায়ত্ব বুকে চেপে নির্বোধ বোধে তাকিয়ে দেখছি তোমায়।
তাকিয়ে দেখছি তোমার মন মস্তিষ্কের নিরন্তর সমর্পন।
তোমার ঝুলে পরা গালের চামড়ায়,
কতকাল আদরের কোলাহল নেই।
নেই তোমার বুকের ওমে যৌবনের উষ্ণতা।
তোমার যেমন ঘুমের কোনো তাড়া নেই,
তেমনি নেই কোনো জেগে ওঠার অস্থিরতা।
তুমি কেমন সময় কাটানোর বাহানায় দিন গুনো,
তিন বেলা খাবারের প্লেটে সকাল দুপুর রাতের গল্প আঁকো বাবা।

আমি কেবল তোমার কপালের কুঁচকে যাওয়া নিয়তিতে,
আমার নিজের ভাগ্যরেখার ছায়া দেখি।
দেখি আদি থেকে অন্ত একই চক্রবুহ্যে আবর্তিত হচ্ছি আমরা,
শিশু থেকে যুবক, যুবক থেকে পুরুষ।
আবার পুরুষ থেকে বৃদ্ধ আর বৃদ্ধ থেকে মৃত্যুর চিত্রকল্পে ডুবে যাওয়া মানব জন্মের ইতিবৃত্ত।

আমার ছেলেটাও একদিন এভাবেই আমি হয়ে উঠবে,
আমি হয়ে যাব অবিকল তুমি।
আর তুমি!
তুমি কোথায় কোন সুদূরে হারিয়ে যাবে বাবা।
আমি তোমাকে দেখি আর এভাবেই আমার জীবন দেখি।
আমি তোমাকে ভাবি আর বাড়তে থাকে আমার গহিন গোপন জীবন দহন!

বাবা!
তোমার কী খুব একা একা লাগে?
কোনো বন্ধু নেই, আড্ডা নেই, উৎসব নেই,
অফিস নেই,
নেই তোমাকে যখন তখন সোহাগে জড়িয়ে ধরার কোনো বুকের ওম।
আমিও তোমার অবয়বে তাই আমার ভবিষ্যত দেখি, আমি আমার এই বিদগ্ধ ভবিষ্যত দেখে দেখে;
মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি বাবা।
আমার চোখের আব্রুতে কেবল ঝুলতে থাকে,
পিতার মুখচ্ছবিতে পুত্রের নকশা রূপ ;
পুত্রের ভবিষ্যত বায়োগ্রাফিতে অবিকল পিতার মুখ।

 

নাজনীন নাহার – কবি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.