Take a fresh look at your lifestyle.

বৃন্তচ্যুত রক্ত গোলাপ

275

 

আমি রাসেল !! শেখ রাসেল !!
হাসু, রাণু আপার আদরের ছোট্ট ভাই !!
একেবারে এতোটুকু, ছোট্ট সোনা ভাই !!
আর ।। আমাদের পিতা । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব এর নয়ন মনি, রাসেল, শেখ রাসেল !! আমিই শেখ রাসেল ।।

আজ পঁয়তাল্লিশ বছর পরও, আমার আত্মা ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের বাড়ি, গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়াসহ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের আনাচে-কানাচে কেঁদে ফেরে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে !!
আমি !! আমি সেদিনের কথা ভুলতে চাই,
শান্তশিষ্ট সুবোধ বালকের মতোই মাটির ঘরটায় নীরবেই থাকতে চাই ।।
কিন্তু, আমার আত্মা !! আমার আত্মা, সেই পনেরোই আগষ্ট – পঁচাত্তর এর ভয়াল রাতের ভয়ালদর্শনে,
আমার অজান্তেই ডুকরে ডুকরে কাঁদে,
আমার মস্তিষ্ক পাগল হয়ে যায়,
আমি উন্মাদের মতো ছুটে চলি,
একটু শান্তি,
এতোটুকু শান্তির আশায় আমার মা মাটি দেশ এই বাংলায়, তোমাদের নীড়ে নীড়ে !!

ওরা !! ওরা আমার চোখের সামনে আমার আব্বা,
তোমাদের বঙ্গবন্ধুকে ব্রাশফায়ার করলো,
শিমূল তুলার মতোই উড়ে চিৎকার দিয়ে ছিটকে পড়লো সিঁড়িতে,
তাজা লাল রক্তে রঞ্জিত হলো বাড়ির সাদা দেওয়াল !!
সিঁড়ি বেয়ে পড়া গরম রক্ত আজও আমার চোখের কনীনিকায় আছে মিশে !!
তারপর গোঙাতে গোঙাতে নিথর হয়ে পড়লো আব্বা !!
,
আমি দৌড়ে পালালাম,
একবার টেবিলের নিচে,
একবার খাটের নিচে,
আবার আলমারির পিছনে ।।
পরিশেষে, এএফএম মহিতুল ইসলাম ভাইয়াকে জাপটে ধরে কেঁদে কেঁদে বাঁচার চেষ্টা !!
শুধুই বাঁচার চেষ্টা !!
সেই ভয়াল দৃশ্য, আমি ভুলতে পারিনি আজও !!

পাশের রুম গুলোতে চলছে__
বুলেটের মুহুর্মুহু গর্জন
আত্মীয় স্বজনের চিৎকার,
ভাইয়ের প্রাণ যাওয়ার বেদনাদায়ক দীর্ঘশ্বাস,
মায়ের কান্নার রোল,
আর ফ্লোর বেয়ে চলছে রক্তের জলোচ্ছ্বাস !!
ভয়ে ভেজা বেড়াল ছানার মতোই মহিতুল ভাইকে জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপছি,
বোবা কান্নায় কাঁদছি,
আর ।। আর তাজা প্রাণ গুলোর চুপ হয়ে যাওয়া গুমোট শব্দ শুনছি !!

পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের মতোই,
সর্বশেষে, আমার সময় হলো যাওয়ার !!
দ্রুত পায়ে খটখট বুটের শব্দেই এগিয়ে এলো এক হায়না ।।
ওনাকে দেখেই আমি বললাম, আমাকে মেরো না,
আমি মায়ের কাছে যাবো,
আমাকে তোমরা হাসু আপার কাছে দিয়ে আসো,
হাসু আপা !
মা ! মা !
আমি মায়ের কাছে যাবো !!

নরম সুরেই বললো নরপশুটি, “চল তোকে তোর মায়ের কাছে নিয়ে যাই ।”
তারপর টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতেই,
দেখলাম মায়ের ঘরের দুয়ারে রক্তে রঞ্জিত পড়ে আছে মা, আমার মা, মা জননী, সিঁড়িতে আব্বা !!
ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতেও পারিনি, নীরবেই গড়িয়ে পড়লো অশ্রুজল ।।

হঠাৎ করেই বাম বুকের পাঁজরে সজোরে বুটের আঘাত,
ছিঁটকে পড়লাম দেওয়ালে, কচি বুকের হাড়গুলো মটমট করে গেলো ভেঙে,
তারপর চললো বুলেটের বর্বরোচিত বর্ষণ আমার বুকে,
চোখ ফুটে বের হয়ে আসলো,
মেধাবী মাথা থেঁতলে নিশ্চিত করা হলো আমার মৃত্যু !!
আহঃ !! কী ভয়ানক সেই যন্ত্রণা !!
আমি ভুলতে পারিনি আজও !!

কোন কোন সময়, হঠাৎই দমকা ঝড়ে
মাটির জলন্ত প্রদীপ নিভে যায় !!
পিপিলিকার দংশনে অনাদরে ই ঝরে পরে নবজন্মা গোলাপ কুঁড়ি,
তাই বলে….!! তাই বলে এতোটা নিষ্ঠুরতম নিষ্ঠুরতায়…..!!

বাংলা জাতিসহ পৃথিবীর সকল জাতির বিবেকের কাছে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা !!
মায়ের বুক থেকে কেড়ে নিয়ে দশ বছরের একটা ছোট্ট শিশুর ছোট্ট হৃদপিণ্ড ফুটো করে, মৃত্যু নিশ্চিত করতে কয়টা বুলেট লাগে ?

অপরাধীরা শাস্তি পেয়েছে, খুব খুবই খুশি হয়েছি !!
আমি নাই, আমার পিতামাতা ও ভাইও নাই,
দেশ কি রাসেলের মতো শিশু হত্যা বন্ধ হয়েছে ??
কলঙ্ক মুক্ত হয়েছে দেশমাতৃকা ??

আমি !! আমি আবার আসবো এই মাটিতে,
আমার সোনার বাংলায় ।।
এক রাসেল নয়, পৃথিবীর সমস্ত নির্যাতিত রাসেলর শক্তি নিয়ে তোমাদের মাঝে ।।
কথা দিলাম, তখন আর কোন শিশু রাসেলের রক্তলেখায় রঙিন হবে না বাংলার কাদামাটি !!
ঝড়ে পড়বে না, রাসেলের মতো সদ্য ফোঁটা,
বৃন্তচ্যুত লাল রক্ত গোলাপ !!

যেদিন আমার, আমার পিতামাতার আত্মাহুতির এ স্বাধীন দেশ সোনার বাংলা,
সম্পূর্ণ ও প্রকৃত স্বাধীন অখণ্ড ভূমি হবে,
যেদিন আমার পিতার আপামর জনতার পরাধীনতা মুক্তের যুদ্ধ বন্ধ হয়ে হবে স্বতন্ত্র জাতি,
সেদিনই আমি হবো শান্ত, আমার আত্মার শান্তি, আমার হবে মুক্তি !!

 

নীল- কবি ও গবেষক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.