Take a fresh look at your lifestyle.

অম্বরে অন্তনীলে সে (শেষ পর্ব)

193

 

কৌশিক বাচ্চা ছেলের মত কান্না করে।রুনুর অস্থির লাগে।সব কিছু ছেড়ে এক দৌড়ে কৌশিকের কাছে যেতে ইচ্ছে করে।রুনুর সব কিছু এলোমেলো লাগে যেনো। সব ।
কে কৌশিক ও জানে না।কবিতা কে তাও জানে না।শুধু জানে কৌশিক নামে এক ছেলে কবিতাকে ভালোবাসতো খুব।কবিতা হারিয়ে গিয়েছে নিয়তির নিষ্ঠুরতায়।আচ্ছা কৌশিক যে এতো পাগল রুনুর সাথে কথা বলতে সেটা তো কবিতার জন্যই তাই না? রুনুর প্রতি ওর কোন টান ভালো লাগা কিছুই তো নেই।রুনুর রাগ হয় নিজের ওপর।কেনো কথা বলবে ও?
কৌশিক তো কবিতাকে ভালোবাসে, রুনুকে তো না।
রুনু খুব করে নিজেকে শাসন করে।আর না।আর কখনই না।কৌশিকের ফোন সে ধরবে না।
সারাদিন কাজে ব্যস্ত রাখে নিজেকে।ফোনটা সাইলেন্স করে ড্রয়ারে ফেলে রাখে। আজ কিছুতেই ফোন ধরবে না ও।কিছুতেই না। ঘড়ির কাটা তিনটা পেরিয়ে যায়।রুনু তার ছোট্ট বেলকনিতে বসে থাকে।কিছুতেই সে ফোন ধরবে না।চোখ দিয়ে কেনো যেনো পানি গড়িয়ে পড়ে।
যে ভালোবাসা তার নয়, তার জন্য কেনো তার মন পুড়ে। রুনু যখন এসএসসি পরিক্ষা দিলো।সৎ মায়ের বুদ্ধিতে দশ বছরের বড় এই লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দায় সারলো বাবা ।আজ দুই বছর হচ্ছে রুনু এই বাড়িতে এসেছে। ওর স্বামী কামাল বেশ বয়সে এসে বিয়ে করেছে।তার বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো একজন সেবিকা নিয়ে আসা।তার বয়স্ক মায়ের সেবা করা। সংসারের কাজগুলো করার জন্য বিয়ে ছাড়া স্থায়ী কাজের লোক পাবে কোথায় তারা।
কামাল ভালোবাসতে জানে না।
কখনও রুনুকে বলে না,..”তোমাকে নীল শাড়িতে বেশ লাগে।”
কখনও তাকে নিয়ে রিক্সা করেও ঘুরতে বের হয় নাই লোকটা।বয়সের ব্যবধানের কারনে নাকি মনের বৈকল্যর কারনে জানে না রুনু।তার শুধু কৌশিকের কাছে যেতে ইচ্ছে করে।কোন এক কবিতা হতে ইচ্ছে করে। কৌশিককে বলতে ইচ্ছে করে ওর অতীত,
বর্তমান।সব শুনে কৌশিক যদি ওকে নেয়।রুনু কি ছুটে যেতে পারবে? এ সমাজ, সংসার উপেক্ষা করে।কোন এক প্রেমিকের সত্যিকারের কবিতা হতে পারবে সে?
রুনু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।ছুটে যায় ফোনের কাছে।কৌশিক যদি আর কেনদিন ফোন না করে।কৌশিক যদি অভিমান করে।আর যদি কথা না হয় কৌশিকের সাথে।রুনু তো কৌশিককে কিছু বলতে চায়। স্বপ্নের পথে হাটতে চায়।কৌশিকের ফোনের জন্য অধীর হয়ে ক্ষন গুনতে চায়।

(৪)
কৌশিক হুইল চেয়ারটা ঘুরিয়ে আয়নার সামনে আসে।ফর্সা, ঝাঁকড়া চুলের সুদর্শন এক যুবক।চোখের চশমার ফাঁকেও তার চোখ যে কোন মানুষকে মুগ্ধ করবে।জন্ম কাজল পড়ানো চোখ।মা প্রায় বলতেন, আমার কৌশিক রাজপুত্রের মত হয়েছে।কৌশিকের ঠোঁটের কোনে হাসির ক্ষীন একটা রেখা হঠাৎ মিলিয়ে যায়।
তার হাতে ফোন।ঘড়ির দিকে নজর। আজ সে রুনুকে সব বলবে।
রুনুকে বলবে,” রুনু জানো, সেই দিন আমি আর কবিতা বিয়ের শপিং করতে বেড়িয়েছিলাম।কবিতার খুব শখ ছিলো বিয়েতে লাল জামদানি পড়বে।ওর শাড়ি কিনে যখন ফিরে আসছিলাম।রাত হয়ে গিয়েছিলো।বৃষ্টি পড়ছিলো।রাস্তা ফাকাঁই ছিলো।কবিতা গুনগুন করছিলো।সব মনে আছে আমার।জানো আমাদের চেয়ে সুখি কেউ ছিলো না।হঠাৎ একটা ট্রাক উল্টো দিক থেকে এসে আমাদের গাড়ি চুরমার করে দিলো।তিনদিন পরে আমার জ্ঞান ফেরে।আমার কবিতা স্পটডেথ ছিলো।আর… আর আমার চলার শক্তি হারিয়ে যায়। জানো রুনু, আমি হুইলচেয়ারে বন্দি এক মানুষ ।আমি শুধু আমার কবিতাকে হারাই নাই।আমার জীবনের গতিও হারিয়েছি।তুমি আসবে রুনু? আমার কবিতা হয়ে? প্লিজ এসো।আমার জীবনের রংগুলো ফিরিয়ে দাও রুনু? তুমি যেমন হও, যেমন থাকো প্লিজ এসো।আয়নার দিকে তাকায় কৌশিক। আয়নার মাঝে ফর্সা, ঝাকড়া চুলের সুদর্শন ছেলেটার চোখে পানি।আজ সে রুনুকে বলবে, তার অক্ষমতার কথা।আজ সে রুনুকে আমন্ত্রন জানাবে, কৌশিকের প্রিয় একটা কবিতা পড়ার জন্য,বৃষ্টি ছোঁয়ার জন্য,হৃদয়ের উঠোনে আসন পেতে জোছনা দেখার জন্য।আসবে কি রুনু…?

(৫)
কামাল প্রতিদিনই ভাবে আজ একটু আগে বাসায় যাবে।রুনুর সাথে কিছুক্ষন গল্প করবে।দুই বছর হয়ে গেছে তাদের বিয়ের।কিন্তু এখনও রুনু তাকে দেখলে মাথা নিচু করে রাখে।চোখের দিকে তাকিয়ে কখনই কথা বলে না।কি লাগবে কখনও বলেও না।বেচারি সারাদিন মায়ের সেবা করে।কখনও বিরক্ত হয়ে দুটো কথাও বলে না।কামাল অনেকদিন লক্ষ্য করেছে রুনু রাতে ঘুমায় না।কি যেনো ভাবে।ঘুমের মাঝেও কেমন চমকে উঠে। কামাল হয়তো সংসারের দায়িত্ব,অফিসের
দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে রুনুর প্রতি অন্যায় করে চলেছে।

গত বছর রুনুকে নিয়ে তার বাবার বাড়ি যাচ্ছিল রাতের ট্রেনে।রুনু বাচ্চা মেয়ের মত খুশিতে ঝলমল করছিল। কামাল অবাক হয়ে রুনুর আনন্দ দেখছিল।সামান্য ট্রেনে চড়ে এই মেয়ে এত খুশি হবে চিন্তাও করেনি কামাল।
রুনু জানালা দিয়ে হাত বের করে বাতাস ধরতে চাইছিল। এক ধরনের ছেলে মানুষি খেলা। কামাল চিন্তিত মনে বসেছিল তার পাশে।
দেরি হয়ে যাওয়ায় রাতের খাবার কেনা হয় নাই।লম্বা জার্নি।সারারাত ট্রেনেই বসে থাকতে হবে।খাবার নেওয়া দরকার ছিল।রুনু বাচ্চা মেয়ে তার তো খিদে লাগবে।
কামাল রুনুকে বললো, ” তোমার খুদা লাগলে বইলো।কিছু একটা ব্যবস্থা করব। ট্রেন যে এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে বুঝতে পারি নাই।”
রুনু হেসে বললো,” আপনি চিন্তা করবেন না।দুই,তিনদিন না খেলেও আমার সমস্যা নাই।চান্দের আলো,আর বাতাসে আমার মন ভরে গেছে।এখন খুদা লাগবে না। বাহিরে হাত দিয়া দেখেন, বাতাসে মনে হয় হাত খুলে নিয়ে যাবে ….”।রুনু খিলখিল করে হেসে উঠল।
কামাল রুনুর ওপর বিরক্ত হচ্ছিল অনেকক্ষন। রাতে চলন্ত ট্রেনে কেউ হাত এমন বের করে রাখে।
কামাল বিরক্ত গলায় বললো,” হাত ভেতরে নাও। তোমারে নিয়া কোথাও যাইয়াও শান্তি নাই। ট্রেনের জানালা দিয়া হাত বের করে রাখছে কে দেখো তো?.. ”

কামালের ধমকে রুনুর মুখটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেলো।জড়োসড়ো হয়ে বসে রইল চুপচাপ বাহিরে দৃষ্টি রেখে।সারা পথ আর একটা কথাও বললো না।
কামালের মনটা খারাপ হয়ে গেলো।কথাটা অন্য ভাবে বললেও হত।বেচারির খুশিটা নষ্ট করা ঠিক হয় নাই।
কামাল বকা দিতে চায় নাই।কিন্তু না চাইলেও সব সময় এমনই হয়।কামাল জীবনের যুদ্ধে শক্ত হয়ে টিকে থাকতে গিয়ে মনের কোমলতা কিভাবে প্রকাশ করতে হয় ভুলে গেছে।

কামালের কলিগ হায়দার সাহেব প্রায় তার স্ত্রীর জন্য ফুল কেনেন।মেয়েরা নাকি ফুল খুব পছন্দ করে।একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল খুব।অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তার মোড় থেকে কি মনে করে কিছু কদম ফুল কিনল কামাল। কিন্তু সংকোচে ফুলগুলো রুনুকে দিতে পারে নাই।ঘরে ঢুকে টেবিলে রেখে দিয়েছিল।রুনু ফুলগুলো দেখে অবাক হয়েছিল।কিন্তু কিছু জানতে চাইলো না।কিছু ব্যর্থ মানুষ থাকে যারা ভেতরটা কাউকে বোঝাতে পারে না।

আজ অফিস থেকে একটু আগে বের হলেন কামাল সাহেব।কি মনে করে কক্সবাজার যাবার দুটো টিকিট কাটলেন ট্রেনের।অফিস থেকে পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া গেছে।রুনুকে নিয়ে ঘুরতে গেলে মন্দ হয় না।রুনুর সেই হাসিখুশি মুখটা দেখতে প্রায়ই ইচ্ছে করে।
এবার রুনুর কোন ছেলে মানুষি দেখেই আর ধমক দেবে না কামাল।কক্সবাজারের ট্রেনের টিকিট সাথে কিছু কদম বা বেলীফুল নিয়ে রুনুর হাতে দিতে ইচ্ছে করছে।
কামাল সাহেব বর্ষার টিপটিপ বৃষ্টির মধ্য ফুলে কেনার জন্য হাটছেন…. তার ভাগ্য ভালো হলে পেয়ে যাবেন।

সেলিনা রহমান শেলী – কবি ও সাহিত্যিক। 

 

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.