Take a fresh look at your lifestyle.

আপনার চেয়েও আপন

34

 

কয়েকদিন ধরে খুব ব্যস্ত সময় কাটছে। ঠিকমতো নাওয়াখাওয়া করার সময় পাচ্ছি না। ঘরের নতুন লুক আনতে যেয়ে নতুন পর্দা,নতুন মর্ডান সোফা,কার্পেট,বিছানার চাদর আর কতোকিছু পরিবর্তন করতে হচ্ছে। সেই সাথে মজার মজার খাবার রান্না করে ফ্রিজিং করছি। আমার ছেলে শিহাব অনেক দিন পর দেশে আসবে। শিহাব আমার আপন ছেলে না। কথাটা বলতেই বুকের মধ্যে কেমন ধ্ক করে উঠল। ওকে আমি পেটে ধরিনি ঠিক। শিহাব আমার জান,আমার আত্মা, আমার অস্তিত্ব, আমার ভালো থাকা,খারাপ থাকা, আমার সবকিছু। শিহাব আমার বুকের সন্তান। ও কে পেয়েই আমার মাতৃত্বের সাধ পূর্ণ হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি শব্দ মা ওর মুখ থেকেই শোনা।

আমি শিমু আর আমার বর শাহেদ একই কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স,মাস্টার্স করেছি। শাহেদ আমার থেকে এক বছরের সিনিয়র। দুজন দুজনকে ভালো লাগতো। ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা। ভালোবাসা থেকে একসময় পারিবারিকভাবে বিয়ে। শাহেদ মাস্টার্স এর রেজাল্টের আগেই একটা প্রাইভেট ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসাবে যোগদান করে। পোস্টিং হয় সিলেটে। আমরা দুজনই বাবা– মার একমাত্র সন্তান। সেজন্য দুই পরিবারের সম্মতিতে কোন ঝামেলা ছাড়াই আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের একমাস পরেই আমরা নতুন বাসায় চলে আসি। শুরু হয় টোনাটুনির সংসার। শাহেদকে নতুন চাকরি, নতুন সংসার,নতুন বউ নিয়ে হিমসিম খেতে হয়। তারপরেও টোনাটুনির সংসারে ভালোবাসার কোন অভাব ছিল না। সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের ভালোবাসাকে যেন আরও রাঙিয়ে দিচ্ছিল। শুক্রবার হলেই আমরা বিভিন্ন চা বাগান, জাফলং, লালাখাল, হযরত শাহজালাল ( রঃ) মাজার, হযরত শাহপরান ( রঃ) মাজার,তামাবিল, ভোলাগঞ্জ, লোভাছড়া চা-বাগান, লোভাছড়া পাথর কোয়ারী,ফেন্ঞুগজ্ঞ সার কারখানা, রায়ের গাঁও হাওর, বিছানাকান্দি, পান্থুমাই জলপ্রপাত, লক্ষ্মণছড়া,রাতারগুল আরো অনেক জায়গায় ঘুরতে যেতাম। দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো কেটে যেতে লাগলো। আমাদের দুজনের বোঝাপড়াটাও ছিল চমৎকার।

দেখতে দেখতে দু’বছর কেটে গেল। এবার দু’পক্ষই বাচ্চার কথা বলা শুরু করে দিয়েছে। আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম বাচ্চা নিবো। কিন্তু দিন যায় মাস যায় নতুন কোন খবর আসে না। প্রথমদিকে আমরা দুজনই ভেবেছি হবে। এভাবে আরও এক বছর কেটে গেল। এবার আমরা দুজনই ডাক্তারের কাছে গেলাম। কিন্তু সব রকম টেস্ট এর রিপোর্ট পজিটিভ আসলো। আমরা দুজনই হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। ডাক্তারও অভয় দিলো। অনেকের এমন দেরিতে হয়। আমরাও আবার মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে উড়ে বেড়াতে লাগলাম। প্রতিমাসেই অপেক্ষা করি, স্বপ্ন দেখি, আশাহত হই আবার আশা করি। এবার আমার একটু একটু ভয় হয়। মাঝে মাঝে কান্নাও করি। কিন্তু শাহেদ সবসময় আমাকে আগলে রাখে,সাহস দেয়, সবসময় হাসিখুশি রাখতে চেষ্টা করে। ও যতক্ষণ আমার কাছে থাকে আমি ভালোই থাকি। শাহেদ যতক্ষণ অফিসে থাকে আমার খুব একা একা লাগে। আগে যেটা লাগতো না।

প্রথম থেকেই আমাকে সাহায্য করার জন্য সাহায্যকারী নাদিরার মা ছিল। নাদিরার মা’ই সবকিছু করতো আমি শুধু রান্না করতাম। তা-ও নাদিরার মা শিখিয়ে দিতো। মাঝে মাঝে নাদিরা সাথে আসত। খুব মিষ্টি একটা মেয়ে ছিল নাদিরা। শ্যামলার মধ্যে মিষ্টি চেহারা ছিল। লম্বা চিকনচাকন, মাজা পর্যন্ত চুল, হরিণের মতো চোখ, শান্ত একটা মেয়ে ছিল নাদিরা। দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে আমার সাথে ভালো খাতির হয়ে গিয়েছিল। ক্লাস সেভেনে পড়তো। মাঝে মাঝেই আমার কাছে পড়তে আসতো। অসম্ভব মেধাবী ছাত্রী ছিল। আমাকে বুবু বলে ডাকতো। নাদিরার চালচলন কথাবার্তা দেখে বুঝাই যেত না ও বস্তিতে থাকে। ওর সাথে সময় কাটাতে আমার ভালোই লাগতো।

নাদিরা যখন ক্লাস নাইনে উঠলো তখন হঠাৎ একদিন নাদিরাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। থানা পুলিশ করা হলো দুই দিন নাদিরার কোন খোঁজ খবর পাওয়া গেল না। তারপর জানা গেল বস্তির একটা ছেলে নাম নাজিম। নাদিরা ও নাজিম পালিয়ে বিয়ে করেছে। কথাটা শুনে আমার এতো মন খারাপ হলো। বিশ্বাসই হলো না নাদিরা এমন কাজ করতে পারে। ওকে আমি ছোট বোনের মতো ভালোবাসতাম। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল নাদিরা। বাবা অনেক আগেই মারা গিয়েছিল। মা অন্যের বাড়ি কাজ করে খেয়ে না খেয়ে মেয়েটাকে পড়াশোনা করাচ্ছিল। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল নাদিরার মার। কিন্তু মেয়ের এরূপ কাজের জন্য নাদিরার মা খুব ভেঙে পড়েছিল। এলাকার মুরুব্বিদের হস্তক্ষেপে দুই পরিবার বিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়। ওরা ফিরে আসে। কিন্তু আমার দরজা নাদিরার জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

নাদিরার বিয়ের পর আমি খুব একা হয়ে পড়ি। ওকে নিয়েই আমার অনেক সময় কাটতো। কোনকিছু ভালো লাগতো না। অল্পতেই রাগ হয়ে যেতো। এদিকে আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা হচ্ছে না। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। সবারই একই কথা । আমাদের দুজনের কোন সমস্যা নেই। শুধু সময় লাগবে। সবসময় আমাদের হাসিখুশি টেনশন মুক্ত থাকতে বলছে। সেটাই তো থাকতে পারছি না। নাদিরা ও নাজিম মাঝে মাঝেই আমার সাথে দেখা করতে আসতো। কিন্তু আমি দরজা খুলতাম না। এরমধ্যে একদিন শুনলাম নাদিরার বাচ্চা হবে। কথাটা শুনে আমার এতো আনন্দ হলো। আমি সব রাগ অভিমান ভুলে ওদেরকে আসতে বললাম।

একদিন নাদিরা ও নাজিম আমার সাথে দেখা করতে আসলো। দেখলাম নাদিরার সেই উচ্ছ্বলতা আর নেই। কাবু হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। ওকে দেখেই আমার দুচোখ ভিজে গেল। কি অবস্থা হয়েছে তোর! নাদিরাও আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো। এবার আমি নাজিমের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম নাজিমের চোখেও পানি। ছেলেটা দেখতে মোটামুটি সুন্দর। ফর্সা লম্বা ভদ্র চেহারার একটি ছেলে। কথাবার্তা বলে বুঝলাম লেখাপড়া না করলেও ছেলে ভালো। পরিবারে শুধু মা আছে। বাবা নাজিম ছোট থাকতেই ওদের ফেলে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে চলে গেছে। বর্তমানে বাবার কোন খোঁজ জানে না। মা অন্যের বাসায় কাজ করে। নাজিম ভাড়ায় মাঝে মাঝে রিক্সা চালায়। বুঝতে পারলাম সংসারে খুব অভাব। সেজন্য নাদিরাকে অনেক কথা শুনতে হয়। তবে একটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগলো । নাজিম ছেলেটা সত্যিই নাদিরাকে খুব ভালোবাসে। নাজিমকে বললাম, কয়েকদিন পরে আমার সাথে দেখা করতে। আর নাদিরাকে বললাম, প্রতিদিন বিকালে আসতে।

শাহেদকে বলতেই রাজি হয়ে গেল। নাজিমকে একটা নতুন রিক্সা কিনে দিল। নাজিম প্রতিদিন বিকালে রিক্সায় করে নাদিরাকে আমার বাসায় দিয়ে যেত। রাতে ফেরার সময় নিয়ে যেত। আমি নাদিরার জন্য ডিম,দুধ,ফলমূল রেডি করে রাখতাম। রাতে জোর করে ভাত খাইয়ে দিতাম। অন্য রকম নেশায় আমাকে পেয়ে বসল। নাদিরা কি খাবে, কি করলে আরাম পাবে এসবই সবসময় ভাবতাম। শাহেদ ও কিছু বলতো না। আমি খুশি আছি, একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত আছি। এতেই শাহেদ খুশি।

দেখতে দেখতেই নাদিরার শরীর ভালো হতে লাগলো। এতো সুন্দর হয়ে গেল নাদিরা। আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখি। একেই হয়তো বলে মাতৃত্বকালীন সৌন্দর্য। সব মেয়েই এই রূপে নিজেকে দেখতে চায়। ওদের সংসারের অবস্থা একটু উন্নতি হতে লাগলো। নাদিরার শ্বাশুড়ি এখন নাদিরাকে চোখে হারায়। নাদিরা সবসময় বলতো, বুবু বাচ্চাটা তোমাকে দিয়ে দিবো। আমি বলতাম মনে থাকে যেন। এর মধ্যে শাহেদ একদিন বলল, শিমু চল আমরা ইন্ডিয়ায় যাই। বেড়ানো ও হবে,ডাক্তার দেখানোও হবে। শাহেদ আসলে চাচ্ছিল আমার মন অন্য দিকে ঘুরাতে। কারণ দিনরাত শুধু নাদিরা আর বাচ্চার কিসে ভালো হবে তাই ভাবতাম। এমনকি শাহেদের সাথে কথা বললেও ওদের কথাই বেশি বলতাম। ঘুমের মধ্যে ওদের কথা বলতাম।

আমার এরূপ অবস্থা দেখে শাহেদ বলল,ইন্ডিয়া যাওয়ার আগে চল বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। কতোদিন বাড়ি যাওয়া হয় না। আমি বললাম, ” তোমার কি মাথা খারাপ! এই অবস্থায় নাদিরাকে রেখে কিভাবে যাবো।”শাহেদ বলল,বাচ্চা হবার পর তো যেতে পারবে না। আগেই ঘুরে আসি। কথাটা আমার মনে ধরলো। রাজি হলাম যেতে। নাদিরার তখন আট মাস চলছিল। নাদিরা নাজিমকে বারবার সাবধান করেছি আস্তে-ধীরে চলাফেরা করবি, সময়মতো খাওয়া দাওয়া করবি। যাওয়ার আগে নাজিমকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে এলাম।। খাওয়াদাওয়ার যেন কষ্ট না হয়। কিন্তু বাড়িতে এসে কোনকিছু ভালো লাগছিল না। বাসায় আসার জন্য অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। কোনমতে দুই দিন থেকেই বাসায় চলে আসলাম। বাসার সামনে আসতেই নাজিমকে দেখতে পেলাম। ওর চেহারা দেখে আমার বুকের ভিতর ধ্ক করে উঠল।নাদিরা সুস্হ আছে তো! আমাকে দেখেই নাজিম হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আমি বাসায় না ঢুকেই নাদিরাদের বাসায় দৌড় দিলাম। যেয়ে যা দেখলাম তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

আমরা যেদিন গেলাম সেদিন বিকালেই নাদিরা কলপাড়ে স্লিপ খেয়ে পড়ে গিয়ে ছিল। প্রচুর বিল্ডিং হয়। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিলেও বাচ্চাকে বাঁচাতে পারলেও নাদিরাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তখন মোবাইলের এতো প্রচলন ছিল না। সেজন্য আমাদের খবর দিতে পারেননি। দেখলাম নাদিরার মার কোলে একটা ছোট্ট তুলতুলে বাচ্চা। আমাকে দেখেই বাচ্চাটা হেসে দিল। নাদিরা নাকি মারা যাওয়ার আগে অনেক বার বাচ্চাটাকে আমাকে দিতে বলেছে। আমি বাচ্চাটাকে কোলে নিলাম। দেখি একদম নাদিরার মতো হাসি সেই একই রকম চোখ। বাচ্চাটাকে ফেরত দিতেই প্যাঁ করে কেঁদে উঠল। আমি পিছনে না তাকিয়ে চলে আসতে গেলেই মনে হল কে যেন আমাকে টানছে। তাকিয়ে দেখি আমার ওড়নার কিছু অংশ বাচ্চাটা হাতের মুঠোয়। কিভাবে সম্ভব আমি জানি না। উপস্থিত সবাই আমাকে বাচ্চাটা নিতে বললো। আমি শাহেদের দিকে তাকিয়ে আছি। ও কি বলে। আমি কখনও চাই নি এমন পরিনতি হোক।

আমার বাবা-মা, শ্বশুর -শাশুড়ী সবার সম্মতিতে নাদিরার বাচ্চাটিকে আমরা দত্তক নিই। যেহেতু সবার সম্মতি ছিল সেজন্য আইনী কোন ঝামেলা হয়নি। আমরা টাকা দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু নাজিম স্পষ্ট বলে দিয়েছে, “ও কোনভাবেই নাদিরাকে অপমান করতে পারবে না।” তার কিছুদিন পর আমরা বদলি হয়ে কুমিল্লায় চলে আসলাম। সঙ্গে নাদিরার মাকে নিয়ে আসলাম। নাদিরার ছেলেই আমার সন্তান শিহাব।

শিহাবকে পেয়ে আমি যেন দিন রাত্রির কথা ভুলে গেলাম। সারাক্ষণ ওকে নিয়েই থাকি। নাওয়া খাওয়া ঘুম,বিশ্রামের কথা ভুলে গেলাম । আমার পাঁচ বছরেের বিবাহিত জীবনে যেখানে যতটুকু কালো মেঘ জমেছিল। ও এসে যেন সব আলোয় ভরিয়ে দিলো। নাদিরার মা’ই সংসারটা,আমাকে,শাহেদকে আগলিয়ে রেখেছে। আমার মাঝেই নিজের হারানো মেয়েকে খুঁজে পেয়েছে। আমরাও তাকে এখন খালা বলে ডাকি।

বিয়ের দশ বছর পর আমাদের একটা মেয়ে হয়েছে। কিন্তু যেরকম খুশি হওয়ার কথা ছিল আমি হতে পারিনি। তবে এটা ভেবে ভালো লেগেছে শিহাবের একটা খেলার সাথী হয়েছে। এককথায় বলা ভালো শাহেদ আর খালাই ওকে বড় করে তুলেছে। নাম রেখেছি শ্রেয়া। শ্রেয়াও মেনে নিয়েছে বাসার সবকিছু ভালো জিনিস ভাইয়ার। ভাই বোনের খুব খাতির। দুজনই দুজনের দোষ ত্রুটি ঢাকতে তৎপর। ছেলেমেয়েরা খালাকে আপা বলে ডাকে। আমার সবটুকু ভালোবাসা,বিশ্বাস,শিক্ষা, সময় দিয়ে শিহাব আর শ্রেয়াকে বড় করে তুলেছি। এতোটুকু আঁচড় লাগতে দেইনি।

ছোটবেলা থেকেই শিহাব পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। ওকে ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য আমরা ঢাকায় চলে আসি। এস এস সি ও এইচএসসি ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ও কলেজ থেকে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্টিতে অনার্স শেষ করে। তারপর সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে অর্গানিক কেমেস্টিতে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছে। এরপর সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটির স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনির্ভাসিটি অব প্যানসেলভ্যানিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেছে। বর্তমানে শিহাব যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছে। শ্রেয়া ঢাকা মেডিক্যালে পড়ে।

নাজিম প্রথম পাঁচ ছয় বছর আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। শুনেছি এতোদিন মাজারে মাজারে থেকেছে। তারপর থেকে বছর একবার শিহাবের জন্মদিনে এসে কিছু সময় কাটিয়ে যেত। প্রথম দিকে আমার ভয় হলেও পরে বুঝতে পেরেছি ও শিহাবের জন্য নিরাপদ। শিহাবও নাজিম কাকুকে খুব পছন্দ করতো। একেই বলে রক্তের টান। নাজিম আর বিয়ে করেনি। শিহাব বিদেশে চলে যাওয়ার পর অনেকদিন নাজিমের কোন খোঁজ খবর পায়নি। অনেক খুঁজেছি। একদিন হঠাৎ জানতে পারি নাজিম খুব অসুস্থ। শাহেদ তাড়াতাড়ি যেয়ে নাজিমকে সঙ্গে করে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। জানতে পারলাম নাজিমের ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে। একেবারে শেষ পর্যায়। আর বেশি দিন বাঁচবে না।

আমি আর শাহেদ সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার শিহাবকে সব বলে দিবো। সেজন্য শিহাবকে তাড়াতাড়ি দেশে আসতে বলেছি। সব শুনে শিহাব যা সিদ্ধান্ত নেয় তাই হবে।

আজ ভোরে শিহাব এসেছে। আসার পর থেকেই দুই ভাই -বোনের খুনসুটি, হাসি আড্ডায় বাড়িটা মুখরিত হয়ে আছে। ওদের এই আনন্দটাকে নষ্ট করতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আমাকে যে বলতেই হবে। নাজিমের মতো এমন নিঃস্বার্থ, নির্লোভ,ভালো মানুষের শেষ সময়ে এমন পরিনতি হতে পারে না। কতোখানি ভালোবাসলে এভাবে একটা মানুষ সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে। আমি শুধু ভাবছি কিভাবে শিহাবকে বলবো?কিভাবে নিবে ছেলেটা? আমার চিন্তিত মুখ দেখে শিহাব কয়েকবার জিজ্ঞেস করছে, কি হয়েছে আম্মু? আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছি। সারাদিন হৈহল্লা করে কেটে গেল। আমার শুধু বারেবারে নাজিমের মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমরা চাচ্ছিলাম না শ্রেয়া কিছু জানুক। সেজন্য রাতে খাওয়া দাওয়ার পর আমি বললাম, আজ রাতে আমি শিহাবের কাছে থাকবো। এই নিয়ে শুরু হলো দুই ভাইবোনের মধ্যে খুনসুটি। আমার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগলো। অনেক রাত পর্যন্ত চলল আমাদের আড্ডা। একসময় শ্রেয়াকে ঘুমাতে পাঠিয়ে আমি আর শাহেদ শিহাবকে নিয়ে বসলাম। একে একে সব বললাম। শিহাব কিছু বলল না,শুধু চুপ করে মন দিয়ে শুনে গেল। শেষে এটাও বললাম, তুমি যা সিদ্ধান্ত নিবে তাই হবে। আমি আর শাহেদ দুজনই শিহাবের কাছে রাতে থেকে গেলাম। ছেলেটা শুধু সারারাত আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলো কেউ ঘুমাতে পারলাম না।

ভোরের দিকে শিহাব একটু ঘুমালে আমি উঠে নামাজ পড়ে আল্লাহ তায়ালা কাছে প্রার্থনা করলাম। আল্লাহ আমাদের শক্তি দাও, এই কষ্ট সহ্য করার শক্তি দাও।আমি জানি না শিহাব কি সিদ্ধান্ত নিবে। তবে আমি মনেপ্রাণে চাই শিহাব একবার হলেও নাজিমকে বাবা বলে ডাকুক। জীবনের শেষ দিনগুলো বাবা- ছেলে একসাথে থাকুক।

 

ফারহানা জেসমিন মানি – কবি, লেখক ও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.