Take a fresh look at your lifestyle.

ঘর

206

 

কেউ ঘর বাঁধার চেষ্টা করে,আবার কেউ নিজের সাজানো ঘর ভেঙে অন্যের ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখায়।জীবন থেকে উচ্ছিন্নে যাওয়া বকেটে ছেলেটা পুরোদস্তুর ভালো হয়ে গেছে। কাউকে দেখলেই মাথাটা ডানে পাশে কাত করে ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা তো করেই আর সঙ্গে সঙ্গে খোসগল্প জমায়। একটা দুটি চা খরচ করে হাঁড়ির খবরও জেনে নেয়।বিল্লাহ নাম থেকে বিল্লু নাম ডাক পেলেও এখন সে বিল্লাহ নামে সর্বজনের কাছে পরিচিত।কাক ডাকা ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে বিল্লাহ প্রাতভ্রমণে বের হলে মসজিদের সামনেই নামাজ ফেরত দবির চাচাকে দেখলে তাকে জড়িয়ে ধরে হাও মাও করে কেঁদে ওঠে।
:ও চাচা,তুমি ফিরে এসেছে, সবই আল্লাহর রহমত
কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে চাচাকে ছেড়ে চাচার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করে
:এখন শরীর কেমন?
:হ্যাঁ,ভালো বাবা,তয় ডাক্তার কইছে যতদিন বাঁচি ওষধ খাওয়ন লাগবো।
:খাবেন চাচা,তাতে সমস্যা নাই।
বিল্লাহ ৫০০ টাকার একটি নোট বের করে বাড়িয়ে দেয়।
টাকা না নিয়ে ইতঃস্ততভাবে ছলছল চোখে দবির চাচা বিল্লাহের মাথায়ও হাত বুলিয়ে
:টাকা লাগবু না বাবু,তুমি নাকি মেম্বারিতে দাঁড়াচ্ছো
:আপনাগো দোয়া চাচা,আর বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা
:তয় আমাগো একটা সরকারি ঘর দেওয়ন পার,তোমার চাচীটারে নিয়ে খড়ের ছওয়ান ঘরটাতে খুব কষ্টে আছি।
সারা বছর রোদ ঝড় জল পরে ছওয়ানের ফাঁক দিয়ে।
:সবই হবে চাচা।
রঙিন পোস্টারে সারা এলাকা ছেঁয়ে ফেলে আর নির্বাচনের কয়েকদিন আগে ঘুটঘুটে রাতের আঁধারে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যেয়ে মানুষের পা জড়িয়ে ধরে বিল্লাহ বলে
:ভাই,চাচা একটিবার আমারে সুযোগ দিন।
নির্বাচনে অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে বিল্লাহ পাস করে।কিন্তু নির্বাচনে দিন বিল্লাহর গ্রামে তিনজন চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী করলে দেশীয় অস্ত্রে কেন্দ্র দখল নিয়ে মারামারি বাঁধলে তিনজন অসহায় মানুষের জীবন যায়।গ্রামের আত্মীয় স্বজনের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।ভাগাভাগি হয়ে বৃহত্তর ঐক্যের ভালোবাসার সংহতির গ্রাম। তিন গ্রামের ময়মুরুব্বিরা গ্রামকে মনের বিকাশমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না করে মানুষ ধ্বংসের আড্ডাখানা বাজার গড়ে তুলল। বিল্লাহ ১৬ নং ওয়ার্ডের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মেম্বর।তার ওয়ার্ডের মুসলমান পাড়ার পাশে ঋষি পাড়া ঘেঁষে নতুন আদর্শ বাজার গড়ে তুলা হয়েছে। বাঘে মহিষে এক ঘাটে যেমন জল খায় তেমনি মুসলমান আর ঋষি সম্প্রদায় এক চাপে চা খায়ে সৌহার্দ সম্প্রতিটা একটু বেশি মাত্রায় বাড়িয়ে ফেলেছে যার ফলে রাতের অন্ধকারে মুসলমান ময়মুরুব্বিদের নিজের বাড়িতে না খুঁজে ঋষি পাড়ায় খুঁজলে পাওয়া যায়।

বিল্লাহ মেম্বর সরকারি ঘর আসবে বলে ঋষি সম্প্রদায় হনু,মনু,কৃষ্ণ,মহাদেব গতর খাটা দিন আনা খাওয়া লোকদের কাছ থেকে টাকা নেয় ২৫,০০০/- করে।কেউ গয়না,কেউ দেবতাতূল্য গরু,কেউবা বাড়ির বড় গাছটা বিক্রয় করে,কেউ চড়া সুদে টাকা নিয়ে মেম্বার হাতে টাকাটা তুলে দেয়।দবির চাচা ঘর দেবে শুনে সেও আসে মেম্বর কাছে-
:ও মেম্বর আমি ঘর পাবানে
:কেমনে পাবা চাচা,ঘর নেওয়নে টাকা দেওয়ন লাগতেছে
বারান্দায় চেয়ারে বসা মেম্বারের পায়ের পাশে পাকা মেঝেতে বসে পিলারে পিঠটা ঠেস দিয়ে বুকে হাড় বের করা বুড়োটা বিষণ্ণ মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।এত ঘর একটাও হবে না তার এক অতৃপ্ত আক্ষেপে বুকটা চেপে ধরল।সেদিনের স্নেহ সৌহার্দ মুখে জড়িয়ে মেম্বার আজকে জগদ্দল পাথর মূর্তি। দবির চাচা শূন্য হৃদয়ে ছলছল চোখ মুছতে মুছতে চলে যায়।দুদিন পরে দবির চাচা তার মায়ের বউকে দেওয়া সেকালের রূপার বালা আর একমাত্র সম্বল ছাগল বিক্রি করে ২৫০০০/- টাকা এনে দেয় মেম্বরের হাতে।

গ্রামের ময়মুরুব্বি মতো মেম্বরও ঘর দিবার উছিলায় বিনোদিনী কাছে যায়।উদ্ভিন্নযৌবনা বিনোদনী বয়স্ক ভাতা পায়,রাস্তার কাজ করার সুযোগ পায়,মাসে ধান চাউল গম পায়।এমনকি মেম্বর নিজের ঘরের জিনিস চুরি করে বিনোদনীর ঘর সাজিয়ে দিচ্ছে বলে মেম্বার বউ ও মেয়ে একদিন হাজির বিনোদিনীর সোঁদা উঠানে
:ওই মুচি,শালার বাজারি মেয়ে এত শখ আমার ব্যাটার সাথে রাত কাটার,আমার সব জিনিস তোর গর্তে এনে দিচ্ছেরে শালী………
বলতে বলতে বিনোদনীকে ঘর থেকে বের করে বেদম প্রহার করে।গোছা গোছা চুল তুলে আনে মেম্বরের বউ ও মেয়ে।বিনোদনী মা,বাপ কেউ বেঁচে নেই,একমাত্র ভাই ভোরে কাজের খোঁজে বেড়িয়ে গেছে। ঋষি পাড়ার ছোট ছেলে, মেয়ে বিটা, বিটে তাদের চুলোচুলি যুদ্ধ দেখে হাতে তালি দিয়ে অভিনন্দন দিচ্ছে তাদের। কিন্তু কেউ এগিয়ে যাচ্ছে না কারণ সবাই যাচ্ছে আঁটসাঁট ঢঙের বিনোদনীকে সায়েস্তা করার জন্য।বিনোদনী ভাই কনেক বাড়ি এলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে বের হলে মেম্বার নিজেই এর বিহিত করবেন আশ্বস্ত করলে আর যাওয়া হয়ে ওঠে না কনেকের।

প্রায় বছর অতিক্রান্ত হয়ে আকাশে বর্ষার আগমন বার্তা দিচ্ছে তবু মেম্বরের ঘর দেওয়া কোন লক্ষণই নেই।মেম্বরের কাছে বললে সরকার না দিলে কিভাবে দিমু বলে।মুখে মুখে সবার একটাই কথা মেম্বর ভাতে পেট না ওঠা লোকের টাকাগুলো মেরে খেয়েছে।

হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় সবাই মেম্বরকে আটকে ফেলে নতুন গড়ে ওঠা বাজারটায়।দবির চাচা মেম্বরকে দেখে রাগে শরীর জ্বলে ওঠে-
:ঘর দুবানা তা টাকা নাও কেন?
মনুও ক্ষেপে যায়-
:পরের টিইয়া পরের দিতে খুব ভালো লাগে না মেম্বর।
কৃষ্ণ রাগে দাঁত কটকট করে –
:প্রতি মাসে সুদের টিইয়াগুলো দাও
মহাদেব ঠান্ডা মাথায় বলে-
:আজকে তোমায় যখন পাইছি তখন টিইয়াগুলো দিয়েই ওঠুন লাগবেনে মেম্বার
মেম্বারের শরীর ঘামে ভিজে ওঠেছে। এখানে সেখানে ফোন করে কয়েকজন প্রবীণ লোক এসেছে এরইমধ্যে। প্রবীণ মুরব্বিরা টাকা ফেরত তারিখ দিয়ে মেম্বারকে এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দেয়।
তিনটি বছর হয়ে গেল কত তারিখ কত ওয়াদা চলে গেল মেম্বার আর টাকা ফেরত দেয় না।
একদিন কাকডাকা ভোরে দবির চাচী মেম্বারের উঠানে-
:ও মেম্বর ওঠছো নাকি?
চোখ ডলতে ডলতে চাচীর সামনেই এসেই চোখ মেলল মেম্বার –
:তোমায় জন্য একটু ঘুমাতে পারব না দেখছি,কি হয়েছে কও?
:তোমার চাচার বেহান রাত থেকে কেমন করছে মেম্বার, অসুখটা আবার যেন বাড়ছে!
:আমার কি করতে কও?
:কিছু টিইয়া দিলে তোমার চাচারে…
:কিসের আবার টিইয়া,সকালবেলা এই ক্যাচাল পাড়তেয়ে এসেছো কেন?
:না বলছিলাম ঐ ঘরের টিইয়া থেকে
:কোন টিইয়াই পাবা না,ভাগ এখান থেকে
:তা পাব কেন? রাতের বেলা পা ধরে ভোট নিতে পার,আর টাকা নিয়ে মনে করতে পার না।
মেম্বার ছুটে গিয়ে লাঠি তুলে,লাঠির অগ্রভাগ দিয়ে চাচীরে বাড়ির বাইরে দিয়ে গেটবল লাগিয়ে দিতে দিতে বলতে থাকে কোত্থেকে যে আসে সব।
চাচী বাড়ি গিয়ে দেখল বাড়িতে লোকজনের জটলা।
চাচী নিষ্পলক চোখে চেয়ে আছে দবির চাচার নিথর দেহে।চাচী শুধু একবার বলল-
:মরণে সময়ে একটু পাশে থাকতে পারলাম না তোমার,একটু মুখে পানি দিতে পারলাম না রে…..
পাড়া থেকে টাকা তুলে দবির চাচার মাটি হয়ে যায় আসল ঘরে কিন্তু তার বুকে একটি আক্ষেপ থেকে যায় তার বউয়ের একটি ঘর দিতে পারেনি কখনো।
সারারাত আনমনে কেটে যায় দবির চাচীর রাগে দুঃখে আর ও দিকে মেম্বার রাতের আঁধারে বিনোদনীর ঘরে।
ওতপেতে থাকা মনু,কৃষ্ণ, মহাদেব বিনোদিনী ঘরের বাইরের থেকে শিকল টেনে দিয়ে সকালে গ্রামের প্রবীণ ময়মুরুব্বি খবর দেয়।বাজারের খোলা মাঠের মাঝখানে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে বিল্লাহ মেম্বর আর বিনোদিনী। লজ্জা, কত ধিক্কার,কত কষ্ট চাচীর কষ্টের চেয়ে বেশি নয় কি!মেম্বার বউও মেম্বরের দায়িত্ব নিতে চায় না।মেম্বর আর বিনোদিনীকে যখন পুলিশের কাছে তুলে দিবে ঠিক তখনই দবির চাচী মেম্বরের সামনে। চাচী শুধু ঘৃণার চোখে মেম্বরের অন্ধকার মুখে তাকিয়ে একবার বলল-
:মানুষের মনে কখনো কষ্ট দিতে হয় না….

রাজনৈতিক সংকটের কারণে সংস্কৃতির অধঃপতন হয়।

আমিনুল ইসলাম কর্ণেল- কবি ও সাহিত্যেিক। 

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.