Take a fresh look at your lifestyle.

টুনিদের সুখী পরিবার

43

 

ঢাকা শহরের যাত্রা বাড়িতে টুনিদের নিজস্ব বাড়ি। দাদার রেখে যাওয়া ছোট একটি যায়গায় ছোট দু’কামরার একটি ঘরে টুনিদের বসবাস। দু’ভাই বোন আর মাকে নিয়ে সুখী পরিবার।

টুনি নবম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট ভাই মন্টু এবার ক্লাস সেভেনে উঠেছে। বরাবরই দু’ভাই বোন ভাল রেজাল্ট করে তাই ওদের স্কুলে কোন বেতন দিতে হয় না।

তারা কোন কাজকে ছোট মনে করে না। তাই টুনি স্কুলে পড়ার পাশাপাশি আয়ার কাজ করে। আর মন্টু স্কুলের ফুলের বাগান দেখাশোনার কাজ করে।এসব করে ওরা মাস শেষে কিছু টাকা পায়। সে টাকাটা সংসারের খরচের জন্য মায়ের হাতে তুলে দেয়। টুনির মা কুলসুমের আছে একটি সেলাই মেশিন। সে সেলাই করে কিছু রোজগার করে।

ঘরের সামনে এক চিলতে জমিতে দু’ভাই বোন সবজির চাষ করে। দু’জনে খুব ভাব। যা করে দু’জনে মিলেই করে। রাতে দু’জন খুব মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। বাবার মৃত্যুর কথা ভেবে মন খারাপ না করে বাবার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে।

বাবা রহিম উদ্দিন ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের মাষ্টার। তার স্বপ্ন ছিল ছেলে মেয়ে লেখাপড়া শিখে বড় হবে। সমাজের জন্য কিছ করবে।
টুনির বাবাকে সবাই রহিম মাষ্টার বলে চিনত। রহিম মাষ্টার বেঁচে থাকতে স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে অল্প খেয়ে অল্প পরে যেমন সুখে ছিল। মারা যাওয়ার পরেও তার দু’সন্তান দুঃখকে কোনদিন জায়গা দেয়নি।
হঠাৎ রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় রহিম মাষ্টার। তখন কিছু সময়ের জন্য মানষিক এবং আর্থিকভাবে কষ্টে পড়েও উঠে দাঁড়ায় তারা। মানুষ মরণশীল আর যে কোন সময় যে কেউ মারা যেতে পারে এই সত্যিটা যতই কঠিন হোক ওরা মেনে নিয়েছে এবং নিজেদের মানিয়েও নিয়েছে। তাই বাবা চলে যাওয়ার পরে নিজেরাই শান্তনা নিয়েছে। চোখে জল এলে মাকে কখনো বুঝতে দেয়নি। বরং ওরা দু’জনে মাকে আগলে রেখেছে। কখনো মায়ের মন খারাপ দেখলে কিভাবে তার মন ভালো করবে সে চেষ্টাই করে যায়। টুনি মন্টু মাকে খুব ভালো বাসে। যথাসাধ্য মায়ের কাজে সাহায্য করে। মাকে কখনো কষ্ট পেতে দেয়না। ঘরের মরিচা পরা টিনের চালের ফাক দিয়ে বৃষ্টির পানি পরে ঘর ভিজে গেলেও দুঃখ করে না। ঘরের অতি পুরাতন দেয়াল থেকে সিমেন্ট ঝরে পড়লেও কিছু মনে করে না। শুধু মনে মনে ভাবে একদিন ওরা এই ঘরটিকে মেরামত করতে পারবে। স্কুলের সহপাঠীদের দেওয়া অপমান অবহেলা কখনো ওরা গায়ে মাখে না। সব দুঃখ উপেক্ষা করে ওরা ভাল থাকতে শিখেছে।

মায়ের সেলায়ের আয় আর দু’জনের বেতন মিলে খুব সাধারণ ভাবে চলে তারা। প্রতিমাসে কিছু টাকা জমিয়ে রাখে এক স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশায়। ওরা প্রতি মাসেই বেতন পেয়ে দু’জনের টাকা মিলিয়ে বিশ টাকার চিনাবাদাম কিনে। বারান্দার সিরিতে বসে খুব মজা করে খায়। মাকেও হাত ধরে টেনে এনে বসায়। বাদামের খোসা ছাড়িয়ে বাটিতে জমা করে মায়ের হাতে তুলে দেয়। মা খুশি হয়ে ওদের অনেক দোয়া করেন। মাসের এই একটি দিন ওরা খুব আনন্দ করে। ঐ দিনটার প্রতীক্ষায় ওদের মাস কেটে যায়।

মাকে খুশি করার জন্য দু’ভাইবোন সারাক্ষণ ব্যাস্ত।প্রত্যেকটা ঈদের আগে ওরা বাড়তি কাজ যোগাড় করে নেয়। কম দাম হলেও ঈদে মাকে একটি নতুন শাড়ি না কিনে দিলে ওদের চলে না। রাস্তা থেকে খুব সস্তায় নিজেদের জন্যও নতুন জামা কাপড় কিনে। ওরা নতুন জামা না পরলে মা যে তার নতুন শাড়িটি পরবে না। ঈদের রান্নার জন্য কিনে এক কেজি পোলায়ের চাউল, এক লিটার দুধ, এক প্যাকেট সেমাই, আর একটি ফার্মের মুরগী। ঈদের আগে কুলসুম সেলাইয়ের কাজ করে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি টাকা পায়। তাই ঈদটা ওদের আনন্দেই কাটে।

ছেলে মেয়ে দুটোই খুব কর্মঠ। শুধু তাই নয় ওরা মা বাবার মতই সৎ ও ধার্মিক। নিজেদের মত কাজ এবং পড়াশোনা করে যায় শান্ত মনে। কখনো নামাজ রোজা বাদ দেয়না।

সময় কাহারো জন্য অপেক্ষা করে না। একে একে কেটে গেল বেশ কয়েক বছর। টুনি, মন্টু ওরা বড় হলো। দু’জনই অনার্স মাষ্টারস শেষ করে কলেজের শিক্ষক হয়েছে। বাবার মত সৎ শিক্ষক হওয়াই তাদের ইচ্ছে ছিল। বাবার স্বপ্ন ছিল তার ছেলে মেয়ে বড় হয়ে সমাজের জন্য কিছু করবে। বাবার সেই ইচ্ছে পূরণের জন্যই সেই ছোট্ট বেলা থেকে তারা প্রতি মাসে টাকা জমাতো। অনেক কষ্ট হলেও তারা কষ্টকে হাসি মুখে মেনে নিয়ে অদম্য চেষ্টায় বস্তির গরীব নিরক্ষর লোকদের শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার জন্য একটি স্কুল গড়ে তুলে।

দু’কামরার একটি টিনসেট বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে ওরা স্কুলটা শুরু করে। সকালে ছোটদের এবং বিকেলে বয়স্কদের ক্লাস হয়। সকালে ওদের মা কুলসুম বিকেলে ওরা দু’জন ক্লাস পরিচালনা করে। টুনি পড়ায় বয়স্ক মহিলাদের আর মন্টু বয়স্ক পুরুষদের।

ইতিমধ্যে টুনির কলেজের একজন বয়স্ক শিক্ষক তার সৎ ম্যাজিস্ট্রেট ছেলের জন্য টুনিকে পছন্দ করেন। তার বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। তবে সামাজিক কাজে এবং মায়ের দায়িত্ব পালনে সে সব সময় ভাইয়ের পাশে থাকে। ভাইয়ের বিয়ের জন্য তার কলেজে পরোপকারী সৎ একটি মেয়েকে টুনির চোখে পরে। ভাইয়ের বিয়ের ব্যবস্থা হয়। ওরা সবাই সব সময় একে অন্যের পাশে থাকে। সবাই খুশি থাকে।

ওরা যা পেয়েছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট। ওদের জীবনে ভোগ বিলাসিতা কখনো কাছে আসতে পারেনি আর কোনদিন পারবেও না। সারা জীবন অল্পতেই খুশি থাকে। যেটুকু আছে তা থেকেই পরের উপকার এবং সমাজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে। মাকে খুব ভালোবাসে এবং ভাল রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে।

 

 

দিল আফরোজ রিমা- কবি, ও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.