Take a fresh look at your lifestyle.

দায়

526

 

– বিয়ে করবে আমাকে?
আরশি তার বড় বড় চোখ দুটো মেলে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় তারেকের দিকে। আরশির অবাক হওয়া দৃষ্টি দেখে কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্মিত হাসে সে।
– দেখ পাত্র হিসাবে খারাপ নই। কলেজের চাকরী, বাবার রেখে যাওয়া বাড়ি, নিজের গাড়ি, এক্সিভিশন করেও ভালোই আয় হয়। সুদর্শন হয়তো না। গায়ের রং কিছুটা চাপা, লম্বায় কিন্তু পাঁচ ফিট নয়,
– ঠিক বলেছ, অনেক ভালো পাত্র তুমি
– রাজি?
– না
– কেন? আমার আগে একটা বিয়ে ছিল তাই?
– এই চিনলে আমাকে?
– তবে? একসময় তো চাইতে
– জানো তো সবই। আমার অনেক দায়…. মনে মনে না বলে পারে না আরশি ,” ঠিক বলেছ তারেক ভাই একটা সময় না বুঝে কত চেয়েছি তোমাকে। সুযোগ দিয়েছিলাম তোমাকে। তুমি সুযোগের অপব্যবহার করে আমাকে উচ্ছৃস্টের মত ফেলে দিয়েছিলে। আমি না হয় তোমার আমার ফারাকটা ধরতে পারি নি। তুমি তো পেরেছিলে,তবু আমার সাথে এ অন্যায়টা কেন করলে?
– শফিক দেখে না?
তারেকের কথায় সম্বিত ফেরে আরশির।মাথা নাড় এদিক ওদিক,
– ভাইয়া তো ওর বিয়ের পর থেকে ভাবীকে নিয়ে আলাদা থাকে।ভাগ্য ভালো বাবা রিটায়ার করার পরে যেমন তেমন করে হলেও মাথা গুজার মত একটা ঠাঁই করে গিয়েছিলো। নইলে এই দূর্মূল্যের বাজারে বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকতে হলে উপোস করে মরতে হতো।
– তোমাদের বাড়িটা ডেভেলপারকে দিয়ে দাও না কেন? আজকাল ডেভেলপাররা অনেক টাকা দেয়,
– চেষ্টা করেছিলাম হয়নি
– কেনো?
– আমাদের বাড়িটা দেখেছ?
– না ভেতরে তো যাইনি কখনো। গলির মুখ থেকে বরাবর চলে এসেছি
– গেলে বুঝতে তুমি যে গলি দেখেছ সে গলি ঢুকে আরো একটা সরু গলিতে ঢুকে আমাদের বাড়ি। ওখানে গাড়ি দূর…. একটা রিক্সা ঢুকলে পাশ দিয়ে একজন হেঁটে যেতে পারে না। ওখানে ডেভেলেপার কেন যাবে বলো?
– হুমম্ বুঝলাম। এখন তোমার কি প্ল্যান?
– নিজেকে নিয়ে আপাতত ভাবছি না। ভাই বোন তিনটাকে মানুষ করবো, বোন দুইটাকে বিয়ে দিব এইতো..
– ততদিনে তোমার দিন থাকবে?
– বুড়ি হয়ে যাবো বলছো?
– তাতো হবেই। মানুষের জীবনে যৌবন বড় ক্ষণস্থায়ী জানো তো
– হলামই বা….
– শেষ বয়সে তোমার একটা অবলম্বন চাই না? যাদের জন্য এত ত্যাগ করছো ওরা তখন তোমাকে দেখবে তো?
– না দেখলেই বা। তখন তোমার কাছে আসলে থাকতে দিবে না? তাড়িয়ে দিবে তারেক ভাই? হাসে আরশি। সে হাসিতে যেন অনেক না বলা কথা লুকিয়ে থাকে।
তারেক আরশির কথা শুনে বিব্রতবোধ করে। ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে যায় সে। অনেকদিন আগের একটা দৃশ্য মনে পড়ে যেন। সদ্য কিশোর পেরুনো একটা মেয়ে। রমনায় পাশাপাশি বসে কাতর স্বরে তাকে বলে যাচ্ছে। বলে যাচ্ছে, না বলে অনুনয় করছে বলা ভালো।
– তারেক ভাই, বাবা খুব অসুস্থ। প্লিজ তুমি যাবে একটু দেখতে? গিয়ে শুধু একবার বল “আমার সব দায়িত্ব তোমার, মুখে বললে হবে। আমাকে নিয়ে বাবার খুব চিন্তা। শুধু এটুকু শুনলে বাবা নিশ্চিন্তে যেতে পারেন। প্লিজ তারেক ভাই”
– আরশি তুমি বুঝতে পারছো না। আমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই
– বিয়ে তোমার করতে হবে না তারেক ভাই। তুমি শুধু বাবাকে বল। আমি কেবল বাবার নিশ্চিন্তে যাওয়াটা দেখতে চাই। এরপরে আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমার। আমার সাথে যা হয়েছে তার দাবী নিয়ে কখনো তোমার সামনে আসবো না আমি।
– আরশি ভুল বুঝছো তুমি। আমি অবশ্যই বিয়ে করবো তোমাকে,তবে এই মুহূর্তে সম্ভব না। আমার আরো সময় লাগবে। তাছাড়া এত ভাবছো কেন তুমি? আংকেলকে হসপিটালে ভর্তি করেছ। ট্রিটমেন্ট পেলে সুস্থ হয়ে যাবেন। তুমি বরং টাকাপয়সা লাগলে বলো।ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
সেদিন আরশিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো সে। আরশি তাকে বিয়ে নয় শুধু ওর কাছে বাবার প্রতি একটা আশ্বাস চেয়েছিলো। সে আশ্বাসটুকু ও তারেক দিতে পারে নি সেদিন।ইচ্ছে করে দেয় নি সে। কি করে দিবে ?সে তো জানে আরশিকে সে কখনোই বিয়ে করবে না। আরশির সাথে কোনোদিকে মিলে না তার। না টাকাপয়সায় না আভিজাত্যে। এতদিন আরশিরা আজিমপুর কলোনীতে থাকতো। কিছুদিন আগে মিরপুরে ছোট একটা বাড়ি করেছে শুনেছে। তারেকের যাওয়া হয়নি। শফিক পাশ করে এক বড়লোকের মেয়ের সাথে বিয়ে করে আলাদা থাকে। ওর সাথে ও আজকাল যোগাযোগ হয় না তেমন। আরশির সাথে তার যা সম্পর্ক ছিলো তা তারেকের কাছে ছিলো শুধুমাত্র খাদ্য আর খাদকের।চিরকালের ভোগী পুরুষ সে। যখন যেখানে যত মেয়ে তার চোখে পড়েছে সকলকে সে ছলে, বলে কৌশলে ভোগ করেছে। যেখানে টাকা ছড়ানোর সেখানে টাকা ছড়িয়ে, যেখানে প্রেম বিলানোর সেখানে প্রেম। আরশিকে নিয়ে শুরুতে তেমন কোন ভাবনা তার মনে আসেনি। কলেজ জীবনে শফিকের সাথে তার বন্ধুত্ব। দুজনেই ঢাকা কলেজে পড়তো। সরকারী চাকুরীজীবী বাবার সাথে আজিমপুর কলোনীতে ছোট একটা বাসায় অনেকগুলি ভাইবোন আর মাকে নিয়ে শফিক থাকতো। চিরকেলে ঝা চকচকে বাড়িতে থাকা তারেক শফিকদের বাসায় ঢুকলে কেমন একটা তেলচিটচিটে গন্ধ পেতো।নিজের আভিজাত্য নিয়ে উন্নাসিকতা সবসময় তারেকের ছিলো।সে বন্ধুত্ব করার সময় ও বেছে বেছে করতো। শফিকের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়েছিলো দুটো কারণে।এক শফিকের মেধা। বিভিন্ন সময় সে শফিকের কাছ থেকে পড়াশুনা নিয়ে অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়েছে। বিনিময়ে শফিককে সে ভালো ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়ানো সহ ব্র্যান্ডের ভালো ভালো জিনিস উপহার দিতো। যাকে বলে গিভ এন্ড টেক।ঢাকা য়ুনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষায় শফিক তার হয়ে প্রক্সি দিয়েছিলো। তখন এডমিট কার্ড এ ছবি লাগতো না।আরো একটা কারণে শফিক আর সে কাছাকাছি এসেছিলো। দুজনে তখন শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতিতে জড়িয়ে যায়। এবং এক্ষেত্রে শফিক তার মেধা এবং কর্মকান্ডের জন্য সকলের কাছে’ হিরো’ বিশেষ।বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পরে অনেকদিন রাজনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ হয়ে যায়, পরবর্তীতে রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে ছাত্র রাজনীতির নতুন ধারার পত্তন ঘটে। দলে দলে ছাত্ররা ছাত্রদল, শিবির, এবং কম্যুনিজম নিয়ে মতবাদ তৈরি করে। লীগ তখন অনেকটা অসহায় অবস্থানে ছিলো। আধুনিক আর দশটা ছেলের মত তারেক কম্যুনিজমে দীক্ষা নেয়। যদি ও মনেপ্রাণে সে ছিলো বুর্জোয়া। ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরে শ্রেণীসংগ্রাম থেকে নিজেকে সংকুচিত করে রাখে। মাঝে মাঝে দুই একটা মিছিল মিটিং কিংবা গণসংগীতে তাকে দেখা গেলে ও তা ছিলো অনেকটা লোক দেখানো, কাগজে কলমে সে শ্রেণীসংগ্রাম করলে ও তার ভূমিকা তখন নিষ্ক্রিয়। শফিক বুয়েটে যাওয়ার পরে যোগাযোগ তাদের স্তিমিত হয়ে যায়। কলেজজীবনে শফিকদের বাসায় তারেক আরশিকে দেখে। দেখতে সাধারণ, চলাফেরায় আরো সাধারণ আরশিকে দেখে তার মনে তেমন কোন রেখাপাত করেনি। দুইটা বছর এভাবেই পার হয়। য়ুনিভার্সিটি ভর্তির ও অনেক পরে একটা কাজে শফিকদের বাসায় গিয়ে আরশিকে নতুন করে দেখে যেন তারেক। সেদিনের সেই ছিপছিপে গড়নের শ্যামলা মেয়েটাকে যেন এ কয়দিনে বিধাতা কাদামাটি দিয়ে আবার ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। সেদিনের আরশি আর আজকের আরশি যেন এক নয়। গায়ের রংটা আগের চেয়ে মাজামাজা, লম্বা দোহারার আরশির চোখ দুটো ও যেন তারেককে দেখে ঝলমল করে ওঠে। আরশির চোখের সে দৃষ্টি পড়তে সেদিন ভুল হয়নি তারেকের। তার মনের মধ্যে ঘন্টা বেজে ওঠে টং করে। শরীর জুড়ে একটা তৃষ্ণা টলমল করে বেজে ওঠে। মনে হলো বাজিয়ে দেখতে ক্ষতি কি? বেশি কষ্ট করতে হয়নি। কলেজ গেইটে দুইদিন কথা বলার পরে তৃতীয়দিনে ওকে গাড়িতে নিয়ে আরিচার দিকে লং জার্ণিতে গেছে। এরপরে বাকিটুকু আর বেগ পেতে হয়নি তারেক কে।খুব সহজে তারেকের বুকে ধরা দেয় আরশি।ভালোই যাচ্ছিলো দিন তাদের। এর মধ্যে কি এক আব্দার নিয়ে আসে আরশি। মধ্যবিত্ত কিংবা নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে চায় না তারেক এ কারণে। এরা যে কোন সম্পর্ককে টানতে টানতে বিয়ে অব্দি নিয়ে যায়। সেদিক থেকে আপার ক্লাসের ওরা ভালো। লাইফটাকে এনজয় করতে জানে ওরা। সেদিন অনেক কষ্টে ফিরিয়েছিলো আরশিকে। একটা মৃত্যুপথযাত্রীকে মিথ্যা আশ্বাস দিতে মন সায় দেয়নি তার। আরশি মুখের ওপর তুড়ি বাজাতে নিজের মধ্যে ফিরে আসে তারেক।
– কি হলো? কোথায় হারালে?
পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকায় ওর দিকে তারেক। এগিয়ে যায় আরশির দিকে। ওকে আসতে দেখে সোফায় নড়েচড়ে বসে আরশি। তারেক এসে আরশির কাছে বসে ওকে নিজের দিকে টেনে নেয়।
– কি করছ তারেক ভাই?
বাকি কথা আর বলতে পারে না আরশি। ততক্ষণে তারেকের মুখ নেমে আসে আরশির মুখের ওপর। তারেকের বুকের মধ্যে আরশি ছটফট করতে থাকে। অনেকক্ষন টানা চুমু খেয়ে তারেক আরশির ঠোঁট টা আঙুল দিয়ে মুছে দিতে দিতে বলে,
– বুকের ভেতরটা তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল অনেকদিন। এতদিনে পিপাসা মিটলো
– এটা কি করলে?
– কেন তুমিই তো বললে সব কাজ শেষ করে আমার কাছেই ফিরবে
– তা বলেছি। তাই বলে তুমি এসব বাঁদরামো করবে?
কানের কাছে মুখ এগিয়ে ফিসফিস করে তারেক বলে,
– বাঁদরামো তো করিনি। চুমুই তো খেলাম শুধু। বিছানায় তো নেইনি
ঝট করে ওঠো দাঁড়ায় আরশি
– তুমি কিন্তু ভীষন অসভ্যতা করছো।
আরশি বের হয়ে যেতে চাইলে হাতটা ধরে ফেলে তারেক
– না যেও না। আমার কথা শেষ হয়নি
সোফায় আবার বসে আরশি।
– বল…
– বলছি বিয়েটা না আটকালে পারো
– মানে?
– মানে বুঝিয়ে বলছি বসো।আরশি আমরা তো বিয়ের পরে দুজনে মিলে একসাথে সে দায় নিতে পারি।
– তা হয় না তারেক ভাই
– কেনো হয় না?
– আমার পরিবারের দায় আমার
– তা হলেই বা…
– প্লিজ তারেক ভাই
– আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। তাতে ও তো আটকায় না কিছু। তুমি এখন যেমন জব করছো, তখনো করবে। তোমার টাকা তো আমার লাগছে না। ওদের খরচ এখন যেভাবে চালাচ্ছ তখনো চালাবে। আরশি আমার মেয়েটাকে নিয়ে খুব সমস্যায় আছি, মা বেঁচে থাকলে আমায় এ সমস্যায় পড়তে হতো না। প্লিজ আমার কথাটা ভেবে দেখ।
তারেকের দিকে এক পলক তাকায়। এতক্ষনে তারেকের উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারে সে। মনেমনে হাসে সে। মুখে বলে,
– তোমার তো বিয়ের জন্য মেয়ে পেতে সমস্যা হওয়ার কথা না তারেক ভাই
– হচ্ছে নাই তো…। আমার স্ত্রী হতে অনেকে চায় তবে আমার মেয়ের মা হতে কেউ চায় না।আমি জানি তুমি আমার জীবনে আসলে আমার স্ত্রী এবং আমার মেয়ের মা দুটোই হবে। প্লিজ আরশি
– তবু হবে না তারেক ভাই
– কেন? তুমি কি এখনো রেগে আছো আমার ওপর?
– কিসের রাগ?
– ওই সময় বিয়ে করতে চাইনি বলে,আরশি প্লিজ বুঝার চেষ্টা কর..
– তারেক ভাই আমি কারো ওপরে রেগে নেই।
– তাইলে আপত্তি কিসের?
– তারেক ভাই ওদের শুধু টাকায় হবেনা, প্রোপার গাইডেন্সটা ও দরকার।
– তোমার আম্মা আছেন তো
হাসে আরশি। মাকে দিয়ে হবে না তারেক ভাই।
তারেক ওকে একদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলো। আজ সে তারেককে ফিরিয়ে দেয়। বাসায় এসে পিছনের বারান্দায় গিয়ে কষ্টে অপমানে খুব কাঁদে সে।একটা সময় তারেকের কাছে আড়াল বলে কিছু ছিলো না তার তবু আজ সে তারেকের ব্যবহারটা কিছুতেই নিতে পারে না। তারেকের বুঝা উচিত সেদিনের আরশি আর আজকের আরশি এক নয়। প্রচণ্ড ভালোবেসেছিলো সে সেদিন তারেককে। কিশোরী বয়সের ভালোবাসা আরশিকে বুঝতে দেয়নি তার আর তারেকের সামাজিক দূরত্ব। তারেক যখন বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে তাকে কাছে টেনেছিলো সে নিশ্চিন্তে তারেকের বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দেয়। তারেককে প্রথম যখন দেখে আরশি তখন সে ক্লাস নাইনে পড়ে। সদ্য কিশোরী দুচোখ জুড়ে স্বপ্ন নিয়ে তারেকের দিকে তাকিয়ে থাকতো। দুইটা বছর এভাবে তারেককে শুধু চোখের দেখা দেখে কেটে যায়। নিজের অনুভূতি প্রকাশের কোন সুযোগ হয়নি তার। আরশি কলেজে ওঠে। শফিক বুয়েটে আর তারেক ভার্সিটিতে ফাইন আর্টসে। এবারে শফিকের নতুন নতুন আরো বন্ধু হয়। তারেকের ও। দুজনের গতিপথ পাল্টে যায়। তাদের বাসায় তারেকের আসা হয়না তেমন আর। আরশি পথ চেয়ে থাকে।একদিন তার সে পথ চাওয়া সার্থক হয় তার।একদিন দুপুরে দেখা হয়ে যায় মুখোমুখি। আরশি কলেজ থেকে ফিরে বাসার দরজার সামনে দাঁড়াতে দেখে তারেক বের হয়ে যাচ্ছে তাদের বাসা থেকে।
– তারেক ভাই এতদিন পরে কোথাথেকে?
দেখেই খুশিতে কলকল করে ওঠে আরশি। মুহূর্তে ভুলে যায় তারেকের সাথে এভাবে আগে কখনো কথা বলেনি সে।
– শফিকের কাছে এসেছিলাম,ও নাই। কেমন আছ তুমি?
আরশির দিকে আগাগোড়া তাকায় তারেক। ওর দুচোখে মুগ্ধতার দৃষ্টি নজর এড়ায় না আরশির।
এরপরে কলেজের গেইটে তারেককে দেখে আরশি। এখানে ওখানে প্রায় দেখা হতে থাকে ওদের। আরশি ইন্টার পাশ করে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়।মেলামেশা অবাধ হয়ে যায় আরো। তারেকের বাবা মারা যান আরো আগে। মা বড়বোন তৃপ্তির কাছে বেড়াতে গেছে ইউ এস এ। ফাঁকা বাসায় আরশিকে যখন তখন নিয়ে আসে সে। তারেকের বাসায় তখন মার্কস্,গোর্কি আর লেনিনের বই ভর্তি। এসব বই দেখে আরশি মুগ্ধ হয়ে যায়। তারেকের বুর্জোয়া মানসিকতা ঢাকা পড়ে এসব বইয়ের আড়ালে। দুজনের মেলামেশায় আড়াল থাকে না। এতে তারেকের ওকে কাছে টানার আগ্রহ যত ছিল আরশির ওকে আটকানোর আগ্রহ তত ছিলো না। সে ভাবতে পারেনি, যে ছেলে লেনিন, মার্কস্ টোয়েন পড়ে, গোর্কির মা পড়ে স্বপ্ন দেখে নতুন জীবনের, নতুন সমাজ ব্যবস্থার, রাস্তায় মিছিল করে, গণসংগীত গায়, সে ছেলে বিয়ে করার সময় তার শ্রেণীর কাউকে ছাড়া ভাবতে পারে না। তার এসব শ্রেণীসংগ্রাম নিছক লোক দেখানো,বলতে গেলে ফ্যাশন। লাগামহীন এ মেলামেশা আরো কতদিন চলতো কে জানে? হঠাৎ আরশির বাবা জমির উদ্দীন শেখ স্ট্রোক করে। প্রায় বার চৌদ্দ দিন যমে মানুষে হসপিটালে টানাটানি করে তাঁকে বাঁচানো গেলে ও সম্পূর্ণ প্যারালাইজড অবস্থায় বাসায় ফিরেন তিনি। এরপরে প্রায় সাত আটমাস বেঁচেছিলেন। হুইলচেয়ার ছিল তার বাহন। অসুস্থ থাকাকালীন খুব ক্ষেপে যান আরশির বিয়ে নিয়ে। যাকে কাছে পেতেন তাকে বলতেন আরশির জন্য একটা ছেলে দেখে দিতে। বাবার এই অস্থিরতা দেখে কত কতবার তারেকের কথা বলতে চেয়ে আবার আটকে গেছে। তারেকের কাছে গিয়ে এক আধটু বলেছে। তারেক বারবার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু একবার ও আসে নি। আরশি তারেকের দ্বিধা বুঝতে পারে নি। সে বারবার তারেকের কাছে গেছে, শেষবার যায় যখন জমিরউদ্দীন শেখ দ্বিতীয়বার স্ট্রোক করে হসপিটালে আই সি ইউতে যায় তখন। সেবার বুঝতে পারে তারেক কখনো যাবে না বাবার কাছে। তারেক তাকে নিয়ে খেলেছে। শ্রেণী বৈষম্য নিয়ে যতই রাস্তাঘাটে গলা ফাটাক না কেন আদতে সে বুর্জোয়া মনোভাব থেকে বের হতে পারে নি। সেদিন রাতে বাবা মারা যায়। সংসারের দায়বদ্ধতা এসে পড়ে তার ওপর। জীবন থেকে ছিটকে পড়ে আরশি। একমাসের মাথায় শুনে তারেক বিয়ে করেছে তার বাবার বন্ধুর মেয়েকে। তাদের বিয়ের ঝলমলে ছবি দেখে আরশির বন্ধু মারিয়ার কাছে। যে কিনা তারেকের বউ নিকিতার কাজিন। একটা দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে আরশি সংসার নামক সংগ্রামে নিয়োজিত হয়। পড়ালেখার ফাঁকে একটা বায়িং হাউজে রিসেপসনিস্ট হিসাবে জয়েন করে আরশি। মাঝখানে চারপাঁচ বছর কেটে যায়। ইতোমধ্যে সে অনেক প্রতিকূলতায় পড়াটা শেষ করে একটা প্রাইভেট ব্যাংকে জয়েন করে। মেজ বোন ঊর্ষিকে বিয়ে দেয়। ঊর্ষির বিয়ের সময় ব্যাংক থেকে একটা বড় অংকের টাকা ধার করতে হয়। ফল স্বরূপ সংসার খরচে টান পড়ে। রীতিমত হিমশিম অবস্থায় পড়ে সে। বইমেলায় একদিন হঠাৎ তারেকের সাথে দেখা হয়। দু চার কথা পরে তারেক তাকে তার মডেল হওয়ার প্রস্তাব দেয়।বিনিময়ে মোটা টাকা অফার করে। টাকার অংকটা শুনে অফারটা লুফে নেয় আরশি। কথা হয় প্রতিদিন অফিস ফেরত আরশি তারেকের স্টুডিওতে গিয়ে এক ঘন্টা সময় দিবে। সে অনুযায়ী আজ একমাস ধরে যাচ্ছে আরশি। ওখানে গিয়ে শুনে এই চারপাঁচ বছরে তারেকের জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে। তারেকের স্ত্রী তার একবছরের মেয়েকে রেখে তারেককে ডিভোর্স দিয়ে ওর ই এক বন্ধুকে বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি দেয়। তার ও একবছর পরে তারকের মা মারা যান হার্ট এ্যাটাকে। এতবড় বাড়িটাতে কাজের লোকজন এবং মেয়েকে নিয়ে তারেক একা থাকে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় তাড়াতাড়ি কাজটা শেষ করে তারেকের সংস্পর্শ থেকে সরে আসবে সে।
জীবন থেকে অনেকগুলি বছর হারিয়ে গেছে। আজকাল অল্পতে হাঁপিয়ে যায় আরশি। হাঁটাহাঁটি করতে একদম ইচ্ছে করে না। নন্দিতার জন্য পারেনা। সে প্রতিদিন ঘড়ি ধরে নিয়ম করে এক ঘন্টা হাঁটাবে। এছাড়া আরো কত নিয়ম কানুন, যত্নআত্যির অত্যাচার যে এ মেয়ের হাতে সহ্য করতে হয় সে কেবল আরশি জানে। নন্দিতা আরশির মেয়ে। আরশি সিঙ্গেল মাদার। একটা সময় আরশিকে বিয়ে দেয়ার অনেক চেষ্টা ওর মা করেছে। সে ভাইবোনের দায় দায়িত্বের কথা বলে এড়িয়ে গেছে। সে মাকে বলতে পারেনি, দেবতা ভেবে সে তার পুজার ফুলের যে নৈবদ্য এক প্রতারককে দান করেছে, সে নষ্ট ফুল কোনো দেবতার পুজায় কি করে এখন লাগাবে সে? তার চেয়ে কারো সাথে প্রতারণা না করে একটা জীবন একাকি পার করে দেয়াই কি ভালো নয়? এতিম খানা থেকে নন্দিতাকে নিয়ে আসে সে। নন্দিতাকে নিয়ে আসায় বাসার কেউ খুশি ছিলো না। মা ভাইবোন কেউ না। ওদের দোষ দেয়া যায় না। একে সংসারে অভাব। নুন আনতে পানতা ফুরায়। তদুপরি নন্দিতার ভরণপোষণ তো কম নয়। এই আকালের বাজারে আরশি কিভাবে কি করবে? আরশি পেরেছে। আজ এতটা বছরে আরশি ভাই বোন সবাইকে মানুষ করেছে। ওদের বিয়ে শাদী ও দিয়েছে। মা চলে গেছেন সেই কবে? বাড়ি ভাগ হয়ে গেছে।অয়ন বিয়ের আগে দোতলা করেছে। বিয়ে করে সরাসরি ওখানে ওঠে গেছে। নিচ তলাটা ভাগে আরশি পেয়েছে। সে আর নন্দিতা থাকে এখানে। নন্দিতার পছন্দের ছেলের সাথে ওর বিয়ে দিয়েছে। ছেলেটা খুব ভদ্র। ওদের মনের মত। বাবা নেই, মা বড় ভাইয়ের কাছে থাকে। সে গিয়ে মাকে দেখে আসে।টুকটাক হাতখরচ দেয়।নন্দিতা আর বাচ্চারা ও যায়। আরশির রিটায়ার মেন্ট এর টাকা দিয়ে একটা বুটিকস্ খুলেছে । নন্দিতা চালায়। মাঝে মাঝে সে ও যায়। নন্দিতার বর তুর্যর আয়, আর বুটিকস্ এর টাকায় ভালোভাবে ওদের চলে যায়।
– মা তৈরি? চল….
– হ্যা চল…. । হাঁটুর ব্যাথাটা বেড়েছে। লাঠিটা দরকার। এদিক ওদিক চাইতে নন্দিতা লাঠিটা এগিয়ে দেয়
– এত শরীর খারাপ নিয়ে যাওয়ার কি দরকার ছিল মা?
– তোর বাবা তাকিয়ে থাকবেরে মা। বছরের এই একটা দিনই তো যাই।
নন্দিতা তারেকের মেয়ে। তারেক হঠাৎ এক্সিডেন্ট এ মারা গেলে ওর বোন তৃপ্তি ইউ এস এ থেকে এসে সমস্ত বিষয়াদি বিক্রি করে টাকা নিয়ে চলে যায়। নন্দিতাকে রেখে যায় ঢাকার একটা এতিমখানায়। খবর পেয়ে আরশি গিয়ে সে এতিমখানা থেকে নন্দিতাকে দত্তক নিয়ে আসে। সবাই অনেক বারণ করলেও আরশি সে বারণ মানে নি। কি করে মানবে সে? আরশি তো জানতো তারেক কতটা ক্লাস কনশাস ছিলো। একদিন শ্রেণীবৈষম্যের কারণে তারেক তাকে গ্রহণ করেনি। আজ ও নেই বলে ওর মেয়ে এতটা দূরাবস্থার শিকার হবে তা কি করে হয়? তারেকের মেয়ে তো তার নিজের মেয়ে হতে পারতো। তারেক তো একটা সময় পরে এ মেয়ের জন্যই তার সাথে সংসার করতে চেয়েছিলো। এটা যে তারেকের মত মানুষের কত বড় আত্নত্যাগ হতো সে তো আরশি ভালো করে জানে। এটা কেবলমাত্র সম্ভব হতে যাচ্ছিলো নন্দিতার জন্য। তারেককে সে একসময় প্রচন্ড ভালোবেসেছিলো। উজার করে দিয়েছিলো তার সবকিছু।সেদিন তারেক উদার হতে পারে নি। আজ আরশি সুযোগ পেয়েছে তার কষ্টের প্রতিদান দেয়ার। তারেকের প্রতি আজ তার এক ফোঁটা ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই। তবু তারেকের মানসিক দীনতার প্রতিদান দেয়ার সুযোগ কি করে সে হাতছাড়া করে? যদিও তারেক আজ মৃত। তবু ওপার বলে যদি কিছু থাকে, তবে ওপার থেকে সে দেখবে আরশির এ প্রতিদান।নন্দিতাকে নিয়ে আসে সে।তাকে বড় করে। একদিন নন্দিতার জন্য তারেক তার শেষ বয়সের অবলম্বন হতে চেয়েছিলো। শেষ বয়সে এসে তারেকের মেয়েকেই সে অবলম্বন করেছে। নন্দিতা, আশিফ আর ওদের দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন আরশির চমৎকার সংসার। ওকে নিয়ে তারেকের কবরে ফুল দিতে যায় আরশি। কবরের ওপর ফুলগুলি রেখে চুপিচুপি বলে,
– তারেক ভাই দেখছো? তোমার মেয়েকে আমি হারিয়ে যেতে দিইনি। তুমি একদিন গরীব বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলে আমাকে। বাবাকে দায়মুক্ত করার আশ্বাস চেয়ে তোমার পায়ে পড়েছিলাম। তুমি সে দায় নাওনি। আমার বাবা গরীব ছিলো তারেকভাই তবু তো আমার পরিবার ছিলো, পরিচিতি ছিলো। তুমি যাওয়ার পরে তোমার মেয়ের জায়গা হয়েছিলো এতিমখানায়। ওখান থেকে একদিন সে হারিয়ে যেতো। আমি তা হতে দিইনি। তুমি আমার বাবার দায় নাও নি,আমি কিন্তু তোমার দায় নিয়েছি। ওকে এনে মানুষ করেছি,পরিচয় দিয়েছি, পরিবার দিয়েছি।তোমার প্রতি এটাই আমার সেদিনের প্রতিশোধ তারেক ভাই।

 

শামিমা নাসরিন- কবিও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.