Take a fresh look at your lifestyle.

বউ পর্ব- এক

442

তখনো ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়নি। বাঙলা, ব্রহ্মদেশ, পাকিস্তান নাম ছিল বটে, তবে তাদের আলাদা আলাদা মানচিত্র আর পতাকা ছিল না। ছিল না সীমান্ত নামের কাঁটাতারের বেড়া। এই পুরো অঞ্চটার নাম ছিল ভারতবর্ষ। তখন এ অঞ্চল শাসন করতো সাতসমুদ্র তেরো নদী সাঁতরে আসা ঔপনিবেশিক ইংরেজ বেনিয়া ফেরিওয়ালা জাত। তাদেরকে ঔপনিবেশিক বলার কারণ হলো মানুষ কোথাও ভ্রমণে গেলে বা বনভোজনে গেলে তাঁবু খাটিয়ে কিছু সময় বিশ্রাম করে, তারপর তাদের কাজ শেষে উপনিবেশ বা তাঁবু গুটিয়ে ঘরে ফিরে যায়। ইংরেজরাও এদেশে লুটতরাজ আর পিকনিকে এসেছিল, তাদের কাজ শেষে তাঁবু ( উপনিবেশ) গুটিয়ে চলে গেছে। রেখে গেছে সিফিলিস আর গনোরিয়ার মত অশ্লীল দুরারোগ্য কিছু রোগ। আর রেখে গেছে একই জাতির মধ্যে বিভাজনের কিছু বিষাক্ত মানসিকতা। তারা ভারতবাসীকে আদর করে ‘ব্লাডি নিগার’ বলে ডাকতো। এ গল্পটা সেই সময়কার।

সে সময়ে স্থলপথ থেকে নৌপথে যাতায়াত সুবিধা এবং সাশ্রয়ী ছিল। অধিকাংশ মানুষ তাই নৌপথেই যাতায়াত করতো আর বড় বড় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো ছিল বন্দরকেন্দ্রিক। বোম্বাই, রেঙ্গুন, চাটগাঁ, মঙ্গলা আর বাংলার ভেতরে খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, গোয়ালন্দ ঘাট,নাকালিয়া বন্দরগুলোতে বড়ো চোঙ্গাওয়ালা আর দুইপাশে বিশাল আকৃতির প্রপেলার ওয়ালা ইস্টিমার ভিড়তো।এসব বন্দরের খ্যাতি তখন আকাশচুম্বী। এ অঞ্চল থেকে ও অঞ্চলে,ও অঞ্চল থেকে সে অঞ্চলে মানুষ নানান পণ্যের বাণিজ্য করে বেড়াতো। শমসের মোল্লা বাকেরগঞ্জ থেকে চিলমারী, শ্রীহট্ট থেকে যশোরের নোয়াপাড়া, গোয়ালন্দ থেকে রাজশাহী সমস্ত পূর্ববাংলায় তার মহাজনি নৌকা করে বাণিজ্য করে বেড়াতো। বছরে দুই-একবার কলকাতায় কাঁচা আর শুকনামরিচ, পেঁয়াজ ইত্যাদির খেপ নিয়ে যেতো। কলকার নাম ছিল কলিকাতা,অঞ্চলভেদে কলিকাত্তাও বলতো।তবে শমসের মোল্লারা কইলকেত্তা বলতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতো।কলকাতা থেকে নিয়ে আসতো নানা প্রকারের মসলা ; গরমমসল্লা। বউঝিয়েরা বলতো– কইলকেত্তা গরমমসল্লার খেপে গেছে।
কুষ্টিয়ার কাঁচামরিচ, বগুড়ার শুকনা মরিচ আর তাহেরপুরের পেঁয়াজের একটা নামডাক ছিলো সেই সময়ে।মাঝিদের নিজস্ব চালান না থাকায় তারা শুধু ভাড়াটাই পেত,ব্যবসার পুরো লভ্যাংশ থাকতো মহাজনের।
শমসের মোল্লার পনের বছর বয়সে বাপ-মা সখ করে বিয়ে দিয়ে বউ ঘরে আনেন। তখন বিবাহের আসল উদ্দেশ্য ছিল বংশবৃদ্ধি করা, অন্যটি ছিল গৌণ। যেসব নারীর মাতৃকুলে অধিক সন্তান জন্মদানের ইতিহাস আছে মানুষ বেছে বেছে সেই ঘরের মেয়ে আনতো যাতে অধিক সন্তান জন্ম দিতে পারে।শমসের মোল্লার বউয়ের নাম ছিল জয়গুন বিবি। জয়গুন বিবি বারোটি সন্তানের জননী হয়েছিল। বারোটির মধ্যে বড়টির নাম কাজলি, মেয়ে। কাজলির জন্মের পর থেকে সবাই তাকে কাজলির মা বলে ডাকতে শুরু করে। ফলে তার ‘জয়গুন বিবি’ নামটি কাজলির মায়ের আড়ালে চিরদিনের জন্য চাপা পড়ে গিয়েছিল। জয়গুন বিবির বিয়ের সময় বয়স ছিল এগারো বছর। চৌদ্দ বছর বয়সে কাজলির জন্ম হয়। জয়গুন বিবি চেহারা সুরাতে গায়ে গতরে ভালোই ছিল।

 

আবু সাইফা –  কবি ও সাহিত্যিক।  

Leave A Reply

Your email address will not be published.