Take a fresh look at your lifestyle.

সুপ্ত প্রেমাতাল

489

 

“এই ছেলে নাম কি?” রঞ্জন থমকে গেলো অপরিচিত কন্ঠ শুনে ।ভুল রাস্তায় চলে এলো নাকি।রঞ্জন হাতের সাদা ছড়িটা চারপাশে লাগিয়ে জায়গাটা চেনার চেষ্টা করলো।ঠিকই তো আছে। রিক্সা থেকে নেমে ১২ কদম ডানে হেঁটে এসেছে।একটা চায়ের দোকান প্রথমে। এই সময় বেশ ভীড় থাকে।লোকজনের গলার শব্দও শুনেছে।এরপর আরও ৬ বা ৭ কদম এগুলে একটা ট্রেইলার্স এর দোকান।সেলাই মেশিনের একটানা শব্দ দূর থেকেও শোনা যায়।তারই পরে রমিজ মিয়ার পানের দোকান।রমিজ মিয়ারর সাথে রঞ্জনের মাসের ব্যবস্থা করা আছে। রোজ অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পথে রমিজ মিয়ার কাছ থেকে রাতের খাবারের টিফিনবক্স নিয়ে যায় রঞ্জন।সকালে অফিসে যাবার পথে রাতের টিফিন বক্স রেখে যায়।আর দুপুরের খাবার জন্য নতুন টিফিন বক্স নিয়ে যায়।সকালের নাস্তা রুটি,কলা দিয়েই চালিয়ে নেওয়া যায় বেশ।অন্য দিন রঞ্জনকে দেখলে দূর থেকেই রমিজ মিয়া হাঁক ছাড়ে।

“কৈরে কৈতর টিফিন বাটি দে। ”

কৈতর কে?কত বড় রঞ্জন কিছুই জানে না।আসলে জানতে ইচ্ছে করলেও জানতে চাইতে লজ্জা হয়।কি জানি কি মনে করে রমিজ মিয়া।এই সময়টা হয়তো রমিজ মিয়ার দোকানে ভীড় কম থাকে।তাই রমিজ মিয়া ২/৩ টা সুখ দুঃখের গল্প করে এই সময়।

“বুঝলেন রঞ্জন ভাই।দুনিয়া বড়ই খারাপ জায়গা।এই যে চক্ষে সমস্যা নিয়ে আপনি চাকরি করেন টিচার মানুষ।আর হাত, পা, চোখ, কান ভালো পোলাপান গুলো সব বাদাইমমার মত তাস খেলে, সিগারেট, গাজা খায়।বদমাইশ সব।”

রমিজ মিয়া রাগে গজগজ করে।রঞ্জন হ্যা, না এর বেশি কথা বাড়ায় না।এই দোকানের পাশেই বখাটে ছেলেগুলো আড্ডা দেয়।তাদের হাসি তামাশাও কানে আসে রঞ্জনের।সে বিবাদে যেতে চায় না।তাদের এই কথোপকথনের মাঝে কেউ একজন রঞ্জনের হাতে টিফিনের বাটি ধরিয়ে দিয়ে যায়।কখনও কখনও গলা নামিয়ে বলে,” গতকাল সালুনে লবন কম হইছিলো কিছু মনে নিয়েন না।”

আবার কখনও বলে,” কিছু খেতে মন চাইলে বইলেন।রান্না কইরা দিমুনে।”

রঞ্জন কিছু মনে করে না।এই যে দরদ দিয়ে কেউ বলছে কিছু মনে না করতে বড় ভালো লাগে তার। কখনও জিজ্ঞাসা করা হয় না।আচ্ছা আপনি কি কইতর?আপনার গলার স্বর অনেক সুন্দর। আমার মায়ের গলার স্বর এমন ছিলো।খাবার কি আপনি রাঁধেন? আপনার রান্না অনেক ভালো। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এতো ভালো রান্না করার জন্য।”
রঞ্জন প্রায়ই ভাবে মেয়েটাকে সামনাসামনি ধন্যবাদ দেবে।কিন্তু দেওয়া হয় না।মনে মনেই দিতে হয়।রঞ্জন এতো লাজুক কেনো নিজেও জানে না।টিফিন বক্স হাতে নিয়ে রঞ্জন সাদা ছড়ি সামনে বাড়িয়ে দেয়।সামনের রাস্তাটা বাঁধাহীন আছে কি না বুঝতেই যার চলার পথ শেষ হয়, এতো আবেগ, এতো কৌতূহল দেখানোর সময় কোথায় তার?

“এই ছেলে, কথা বলে না কেনো?” ভারি কন্ঠে রঞ্জন চমকে ওঠে।বলে, “আমি রঞ্জন।কিছু বলবেন?”
লোকটা শব্দ করে পানের পিক ফেলে।বলে,
“আপনি রমিজ মিয়ার কি লাগেন?”

রঞ্জন বলে, আত্নীয় কেউ না।কেনো বলুন তো?”

“রোজ রোজ টিফিন বক্সে কি দেয় আপনারে?”

রঞ্জন বিরক্ত হয়।বলে,” খাবার দেয়।কোন সমস্যা?”
সাথের একজন বলে, “খাবার দেয়? আমরা কি হইলাম গো কাদের ভাই? আমাদের কি ক্ষুধা পায় না?”
আর একজন বলে উঠে, “এইডা এই অন্ধ বেটারে জিগ্যাস ক্যান তোর কৈতররে জিগা।”
সবাই হেসে ওঠে।রঞ্জন দাঁড়ায় না। চলে আসে।রমিজ মিয়ার দোকান পার হয়েই হয়তো চলে এসেছিলে।পেছন থেকে পরিচিত কন্ঠস্বরে থমকে দাড়ায় রঞ্জন।
“টিফিন বক্স না নিয়া চলে যান কই? ”
রঞ্জন হাত বাড়িয়ে দেয়।মেয়েটা টিফিন বক্স দিয়ে নিচু স্বরে জানতে চায়, “ওরা আপনারে আটকাইছিলো ক্যান? কিছু বলছে আপনারে?”
রঞ্জন মৃদু হাসে। কিছু বলে না।সাদা ছড়ি সামনে বাড়িয়ে চলে আসে।
কৈতরও দাঁড়ায় না।রাস্তার লোকজন তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।এই মানুষ টা এলাকায় আছে ৩/৪ মাস হলো।রোজ সকালে সাদা ছড়ি নিয়ে কলেজে নাকি কই যেনো যায়।বিকেল গড়িয়ে গেলে ফিরে আসে।লোকটা চোখে দেখে না সবাই জানে।তারপরও লোকটার দিকে হা করে সবাই তাকিয়ে থাকে।তাদের এই দৃষ্টি কৈতরের অসহ্য লাগে।কি দেখে তারা?একজন অন্ধ মানুষরে হা করে দেখার কি আছে?

কৈতর রাতে বাতি জ্বালিয়ে চোখে কাজল দেয়।তেলহীন চুলে চিড়ুনি আটকে যায়।তেল শেষ। তাই চুলে তেল দেওয়া হয় না অনেক দিন।ভাইজানরে বলতে তার ভয় করে।ভাইজান কারণেঅকারণে শুধু ধমক দেয়।আচ্ছা রঞ্জন নামে লোকটারে সে যদি একদিন বলে, তার চুলের তেল লাগবে লোকটা কি এনে দেবে?
নিজের মনেই হাসে কৈতর।কি সব যে তার মনে হয়।রঞ্জন ভাই শিক্ষিত মানুষ।কলেজের টিচার।চোখে না দেইখ্যাও বড় পাশ দিছে।আর কৈতর।মাত্র টেন পাশ।তাও গরীব ঘরের মাইয়া।কিন্তু রঞ্জন ভাইকে তার বড় ভালো লাগে।হ্যা, না ছাড়া কিছুই বলে না।কৈতরকেও আপনি আপনি করে বলে।
একদিন কৈতরকে বলেছে,”আপনি রোজ আমার জন্য খাবার রান্না করে দেন।একদিন আমার বাসায় আসবেন কফি বানিয়ে খাওয়াবো।”

কৈতর কিছুই বলতে পারে নাই।রঞ্জন ভাইয়ের কত বড় শিক্ষিত মানুষ।কলেজের টিচার।তিনি কৈতরকে কফি বানিয়ে খাওয়াবে বলছে চিন্তা করা যায়!একটু পরেই তার মনে চিন্তা কাজ করে,, লোকটা যে কফি বানায় না দেইখা, আগুনে যদি তার হাত পুড়ে যায়।বড় কোন দুর্ঘটনাও তো ঘটতে পারে।লোকটাকে তার বলতে ইচ্ছে করে, “আপনার কফি খেতে ইচ্ছে করলে আমাকে বলবেন।আমি ফ্লাক্স ভর্তি কফি বানাইয়া দেবো।”
কিন্তু কিছুই বলা হয় না।লোকটা না জানি কি মনে করে।

একদিন রঞ্জন রমিজ মিয়ার সাথে কথায় কথায় বললো, ছোট বেলায় তার মায়ের হাতে পাটিসাপ্টা পিঠা খুব পছন্দ করতো।মা মরে যাওয়ার পর আর মনে পরে না পাটিসাপটা খেয়েছে কি না।
রমিজ মিয়া রঞ্জনকে খুবই পছন্দ করে।
সে বলে,” রঞ্জন ভাই আমি গরীব মানুষ আপনার জন্য কিছুই করতে পারি না।সকাল, বিকাল বোনটা রাইন্ধ্যা দেয় আপনারে এইটার জন্যও টাকা নেই।আমি বড়ই শরমিন্দা। ”
রঞ্জন বলে, ” আরে কি বলেন।আপনারা না থাকলে খাওয়াদাওয়া নিয়ে কত ঝামেলায় পড়তাম বলেন তো।”
কৈতর আড়াল থেকে প্রায়ই তাদের কথা শুনে।রঞ্জন বুঝতে পারে।পরের দিন রাতে টিফিন বক্স খুলে রাতের খাবারের সাথে পাটিসাপটা পিঠার গন্ধ পায় সে।
অনেকক্ষন সে পিঠা হাতে বসে থাকে।এই ভালোবাসাটা কৈতর কেনো দেখায় তার প্রতি।কৈতর তো দেখে সে অন্ধ। সাদা ছড়ি ছাড়া তার সামনের পথ অচেনা বিপথের সুরঙ্গ।
রঞ্জন পিঠার জন্য সামান্য ধন্যবাদও দিতে পারে না।তার গলার কাছে কেমন চাপা এক কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে।

কৈতর খুব আশায় ছিলো রঞ্জন ভাই তাকে পিঠার জন্য ভালো কোন কথা বলবে।কিন্তু না।রঞ্জন ভাই পিঠা নিয়ে কিছু বলে না।যেনো পিঠা পায় নাই এমন একটা নির্লিপ্ত ভাব করে।কিংবা কে জানে হয়তো বিরক্ত হয়েছে কৈতরের ওপর।কৈতর অপেক্ষা করে কোন একদিন সুযোগ হলে সে জানতে চাইবে, পাটিসাপটা কি ভালো হয় নাই? নাকি রঞ্জন রাগ করলো পিঠা দেওয়ায়?
দুই দিন খুব ভয়ে ছিলো কৈতর।রঞ্জন ভাই যদি রাগ করে ভাইকে বিচার দেয়।কিন্তু না রঞ্জন কিছুই করলো না।

একদিন রঞ্জনের কাছে রমিজ মিয়া আফসোস করে বললো, “বইনডারে আর এখানে রাখবো না রঞ্জন ভাই।”
রঞ্জন চমকে উঠেছিলো।রমিজ মিয়া আপন মনে বললো, ” সামনের মাস্তান পোলাগুলো খুব জ্বালায়।কৈতররে বিয়া দিমু রঞ্জন ভাই।কোন পোলা হাতে থাকলে বইলেন।”
রঞ্জন কথা বাড়ায় না।তার মনটা কেমন যেনো করে ওঠে। প্রায়ই তার মনে হয় কৈতর তার জীবনে এলে খুব ভালো হতো। কৈতরের কন্ঠ স্বর তার মায়ের মত।কৈতরের যত্ন, কৈতরের চুড়ির শব্দ তার কাছে কেমন লাগে কোনদিন কি সে কৈতরকে বলতে পারবে?

কৈতর রোজ ভাবে রঞ্জন ভাই কে কোন একদিন সে বলবে,” সাদা লাঠিটা ফেলে দেন তো। আমার হাতটা ধরেন।আমি আপনার সামনের সব কিছু চিনিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবো।ধরবেন রঞ্জন ভাই আমার হাত?”

কৈতরেরও বলা হয় না, যা সে বলতে চায়।শোনাও হয় না, যা সে শুনতে চায়।
এভাবেই দিন যায়।রঞ্জন প্রায়ই ভাবে কৈতরকে কিছু বলবে।কৈতরও প্রায়ই অপেক্ষা করে রঞ্জন ভাইকে কিছু বলবে…..

আমাদের বিশ্বাস কোন একদিন হয়তো সত্যি তারা বলতে পারবে।কিছু কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে নেই। অপেক্ষা করতে নেই কিছু বলার জন্যও না। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় একপা।কে জানে অপর পাশের মানুষটি হয়তো দুই পা বাড়ানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।

সেলিনা রহমান শেলী – কবি ও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.