Take a fresh look at your lifestyle.

স্বপ্ন সাধ

35

আমাদের গ্রামে একটি বড় খাল ছিল। বর্ষাকালে সে খালটি কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে বড় একটি নদীর মত দেখা যেত। খালের উপারে ছিল বাজার। সেখানে সপ্তাহে একদিন হাট বসত। উপারে ছিল গ্রামের অর্ধেক জনবসতি। ছিল কয়েকটি স্কুল, কলেজ থানা, পোস্ট অফিস, ব্যাংক ইত্যাদি। খালের এ পারের লোকজনদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ওপারে যেতে হয়। ছোট বড় ছেলে মেয়েদেরও স্কুল কলেজে যেতে হয়। আবার ওপারের লোকজনের এপারে আসার দরকার হয়।
প্রতিবার বর্ষার সময় হাটবারে কমপক্ষে দুই -তিনটা নৌকা ডুবে যেত। কখনো পাঠ বা অন্যান্য মাল বুঝাই নৌকা ডুবে যেত। আবার কখনো শুধু মানুষ সহ নৌকা ডুবতো। এতে অনেকের প্রাণ যেত। গরীব চাষিদের অনেক ক্ষতি হতো। আর এই ধরনের ঘটনা প্রতি বর্ষাকালেই ঘটতো।
খালের এ পারের একটি মেয়ে ওপারে স্কুলে যেতো। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মালিহা। পড়াশোনায় বরাবরই খুব ভালো ছিল। মালিহা পড়ার সময় মন দিয়ে লেখাপড়া করতো এবং পড়াশোনার পাশাপাশি সে কাগজ দিয়ে ফুল বানিয়ে হাটের দিন বিক্রি করতো। এ কাজে তার পরিবারের লোকজন অনেক বাঁধা দিয়েছে। কারন একজন ছাত্রী নিজে হাতে ফুল বানিয়ে নিজেই হাটে নিয়ে বক্রি করত এটা ওর মা বাবার কাছে শোভনীয় ছিল না। তবে মালিহা থামেনি। ফুল বিক্রি করে সে টাকা গুলো খরচ করতো না। জমিয়ে রাখতো। এ টাকা কেও চাইলেও দিত না।
অনেকে তাকে বলত-এত টাকা জমা করে কী করবি?
সে বলত-দেখি কি করতে পারি।
এমনি করে কেটে গেল বেশ কিছু সময়। বড় ক্লাসে উঠার পরই শুরু করল পুরাদমে টিউশনি। সে ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করতো, ফুলের কাজও ছারেনি। কিন্তু সেসব টাকা খরচ করতো না। নিজে খুব সাধারণ ভাবে চলত। সে জন্য তার মা বাবাও তাকে পছন্দ করতো না। আত্মিয়-স্বজন, পরিচিত জন সবাই তাকে অপছন্দ করত। সবাই তাকে কৃপণ বলত। আর কথায় কথায় বলত-তোমার এত টাকার ক্ষুধা ? এত টাকা দিয়ে কি করবে? জামা কাপড় চেহারার কি অবস্থা ওদিকে টাকা জমাচ্ছে।

মালিহা কখনও কারো কথায় কান দেয়নি। শুধু বলত,
দেখি কি করা যায়। কখনো কারো কথায় রাগ করতো না।
বড় হতে হতে তার বিয়ের বয়স হলো। ততদিনে সে বি এ পাস করে একটি চাকরিও যোগার করে নিয়েছে। মা বাবা আত্মিয়- স্বজন কেউ তাকে বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারল না। সে ছিল খুব সৎ এবং সাহসী আর শক্তিশালী। সেএকটু সময় পেলেই বড় বড় মানুষের জীবনী পড়ত। যারা বড় বড় কীর্তি রেখে গেছেন। সে মনে মনে চিন্তা করতো যারা দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কিছু করেছেন, তারা নিজের জীবনের কথা ভাবার সময় পাননি।
দিন যেতে যেতে একসময় মা বাবা মারা গেল। ততদিনে মালিহারও বয়স বেড়েছে। ভাইরা তাকে চরিত্রহীন অপবাদ দিল। নানা অপবাদে সমালোচনায় মূখর হলো সারা গ্রাম। কিন্তু তার কোন দিকে কোন পরোয়া করার সময় নেই। চাকরি ছাড়াও অন্যান্য কাজ করে সে টাকা জমাতো। নিজে চলতো হত দরীদ্রের মতো। মানুষ তাকে ঘৃণা করত। চলতে চলতে বয়স এক সময় আরো বেড়ে গেল। বৃদ্ধ অবস্থায় একদিন তার মনে হলো তার সময় আর বেশি নেই। তার সারা জীবনের জমানো টাকা ব্যাংক থেকে তুলে আনল। স্কুলের হেড মাষ্টার, থানার ও সি, গ্রামের চেয়ারম্যান সহ আরো গন্য -মান্য কয়েকজনকে তার বাবার বাড়ির এক কোনে তৈরি করা জীর্ণ কূটিরে দাওয়াত দেয়। এই লোকগুলো মালিহার মত মানুষের দাওয়াতে তার বাড়িতে যেতে মোটেই আগ্রহী ছিল না। কিন্তু তারা কৌতুহল বসত মালিহার বাড়িতে যায়। সেখানে মালিহা তাদের সবার জন্য সামান্য চা নাস্তার ব্যবস্থা করেছে। তারা সবাই লক্ষ করল মালিহার ঘরে তেমন কিছুই নেই যা একজন মানুষের জীবন চালাতে খুব দরকার হয়। পাশের বাড়ি থেকে খুব অনুরোধ করে কয়েকটি চায়ের কাপ আর একটি হাপ প্লেট ধার নিয়েছিল।
যাহোক মালিহার হাতে সময় কম। সে তার ছোট বেলা থেকে রোজগার করে তিল তিল করে যে টাকাগুলো জমিয়েছিল তা তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলে, খালের মধ্যে প্রতিবছর বর্ষাকালে কিছু মানুষ প্রাণ হারায়, কত গরীব কৃষক তাদের কষ্টের মাল হারায়। ছোট বেলায় একটি সাধ জেগেছিল, খালের উপরে একটি ব্রীজ বানানোর সাধ। এই টাকাগুলা দিয়ে আপনারা সেই কাজটি সম্পন্ন করবেন।
যারা কৌতুহল বসত মালিহার গৃহে এসেছিল তারাও ঘৃণা করত মালিহাকে। আজ তার কথা শুনে বারবার তাকে স্যালুট জানাচ্ছে।
পরের দিন গ্রামের লোকজন ব্যাপারটা জানতে পেরে মালিহার সাথে দেখা করতে তার জীর্ণ কূটিরে গেল। ততক্ষণে সে এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছে বহুদূর।
গ্রামের সবাই শ্রদ্ধার সাথে তার জানাযা পড়ে দাফন করে কবর দিল। সবাই মন উজার করে দোয়া করল তার জন্য। খালের উপর ব্রিজের কাজ শুরু হলো।
দিল আফরোজ-কবি ও সাংগঠক

Leave A Reply

Your email address will not be published.