Take a fresh look at your lifestyle.

রমজান মুসলমানের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত

237

 

 

রামাদান তাকওয়া অর্জনের মাস। – (সূরা বাকারা)

রামাদানে রয়েছে লাইলাতুল কদর। যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। – (সূরা কদর)

আমার মুসলিম ভাই ও বোনেরা আমার লিখার পারম্ভেই আমি আল্লাহ তায়া’লার কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি কারন তিনি আর একবার মুসলিমের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত রমজান মাসের রহমত পাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। তার কাছে আবেদন জানাই, আমরা সকলেই যেন অফুরান রহমত থেকে কোনভাবেই বঞ্চিত না হই।
রহমত, মাগফিরাত আর নাযাতের বার্তা নিয়ে মুমিনের দরজার সিয়াম এসে উপস্থিত হয় প্রতিবছর।
রাতে তারাবির নামাজ আর সেহেরি খাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রমজানের আনুষ্ঠানিকতা। তারপর দিনশেষে ইফতার।
এই মাস সেই মাস যেমাসে আল্লাহর পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছে। এই মাস সেই মাস যে মাসে আল্লাহর রহমত বৃষ্টির মত পৃথিবীতে বর্ষিত হয়। এই মাস তাকওয়া অর্জনের মাস। সকল মুসলিমদের জীবন গঠনে শিক্ষার মাস। এই মাস আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাস সংযম সাধনার মাস। এই মাস আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস। এই মাস ক্ষমা চাওয়া, ক্ষমা পাওয়ার মাস। এই মাসের রোযা মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত।
পাবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, হে ঈমানদারগণ তোমাদের জন্য রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। আশা করা যায় এর মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে পরহেজগারির গুণ সৃষ্টি হবে। ( সূরা বাকারা)
রাসুলুল্লাহ ( সাঃ) বলেছেন, যখন রমযান মাস আগমন করে, তখন আসমানের দরজা সমূহ খোলা হয়। জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং শয়তানগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়। ( বোখারী)।

রমজানের সব রকম নিয়ম বা বিধান মেনে শুধু রাব্বুল আলামীনকে খুশি করার ইচ্ছায় যদি আমরা সাওম পালন করতে পারি তাহলে আমাদের আত্মার উন্নতি সম্ভব আর রোযা রাখার কারনে আমরা আল্লাহর কাছ থেকে বিরাট পুরস্কার পেতে পারি। তাহলে বুঝা যাচ্ছে রোযা মুসলমানদের কত বড় নিয়ামত।
সিয়াম পালনের মাধ্যমে আমাদের নৈতিক ইচ্ছা শক্তি অর্জিত হয়। সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। ভাতৃত্ব বাড়ায়। আত্মাকে শুদ্ধ করে। শারীরিক সুস্থতা অর্জিত হয়। তবে আমাদের রোযা রাখার আসল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর হুকুম পালন করা, তাকেই খুশি রাখা। তার অনুগত গোলাম হওয়ার উদ্দেশ্যেই আমরা সিয়াম সাধনা করি। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, রোযার বিনিময় ভিন্ন ধরনের কেননা রোযাতো প্রকৃত পক্ষে আমার জন্য। অতএব আমি নিজ হাতেই তার বিনিময় দেব। কারন বান্দা শুধু আমার জন্যই তার পানাহার ও তার সমস্ত কামনা বাসনাকে পরিত্যাগ করে।-
(বোখারী)।
রজমান মাসেই হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুলকদরের রাত আমরা পেয়ে থাকি। এই রাতে আল্লাহর নির্দেশে শত শত ফেরেস্তারা পৃথিবীতে মানুষের জন্য রহমত নিয়ে হাজির হয়। এই মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তাই স্বাধীন চিত্তে আমরা সত্য ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পারি। আল্লাহ আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় খুশি হয়ে আমাদের পাপগুলো মুছে দিয়ে তার রহমতের হাতে আমাদের ক্ষমা করবেন।
সঠিক সাওম পালনকারীকে একজন সৈনিকের সাথে তুলনা করা যায়। যিনি রমজান মাসের কঠিন নিয়মগুলো ধারাবাহিক ভাবে একাধারে পালন করেন এবং তার ইচ্ছে শক্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, রমজান হলো ধৈর্য ও সবরের মাস। এর পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত।
এই মাস এমন একটি রহমতের মাস এই মাসের একটি নফল ইবাদত একটি ফরজ ইবাদতের সমান। আর একটি ফরজ ইবাদত অন্য মাসের ৭০ টি ফরজ ইবাদতের সমতুল্য।

বন্ধুগণ, শুধুমাত্র সারাদিন না খেয়ে থাকলেই সংযম সাধনা হবে তা কিন্তু নয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, রোযা রেখেও যদি কেও মিথ্যা কথা বলে ও তদনুযায়ী কাজ পরিত্যাগ না করে তবে তার শুধু খাদ্য পানিয় পরিত্যাগ করা আল্লাহর কোন প্রয়োজনে নেই। (আল বোখারী)।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, (গোনাহ থেকে আত্মরক্ষার জন্য) রোযা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং রোজাদার অশ্লীল কথা বলবে না বা জাহেলী আচরণ করবে না। কোন লোক তার সাথে ঝগড়া করতে উদ্যত হলে অথবা গাল মন্দ করলে সে তাকে বলবে, আমি রোযা রেখেছি। কথাটি দুইবার বলবে।
যার মুষ্ঠিতে আমার প্রাণ সেই সত্তার সপথ! তিনি বলেন, রোযাদারের মুখের গন্ধ আমার কাছে কস্তুরির সুগন্ধি থেকেও উৎকৃষ্ট। কারণ (রোযাদার) আমার উদ্দেশ্যেই খাবার পানীয় ও কামস্পৃহা পরিত্যাগ করে থাকে। তাই রোযা আমার উদ্দেশ্যেই। সুতরাং আমি বিশেষ ভাবে রোযার পুরস্কার দান করবো। আর নেক কাজের পুরস্কার দশগুণ পর্যন্ত দেওয়া হয়ে থাকে। (আল বোখারী)

আল্লাহ যেন আমাদের তৌফিক দেন এই মাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা সারাটি বছর যেন সংযত হয়ে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে নৈতিকতার পথ ধরে চলতে পারি।
এই মাস থেকে আমরা পরিমিত বোধের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি আর সে শিক্ষা থেকেই আমরা ক্ষুধাকাতর মানুষের কষ্টকে অনুভব করতে পারি।

রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। আল্লাহর রহমত ছাড়া কিছুই আশা করা যায় না। তাই প্রথমেই আল্লাহ আমাদের জন্য বৃষ্টি ধারার মতো রহমত বর্ষন করেন। তারপর মাগফিরাত প্রদান, সবশেষে নাজাতের ব্যবস্থা করেছেন।
লাইলাতুলকদর বা মহিমান্বিত রাত রমজান মাসেই আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়। রোযা আমাদের ইহকাল পরকালের জন্য বিরাট এক নিয়ামত। রোজার মাধ্যমে আমাদের মনে স্থির প্রশান্তি লাভ করতে পারি। শয়তানের দুষ্ট চক্র হতে রক্ষা, রমজান মাসের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা আমাদের সাহায্য করতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের নৈতিক ও মানবিক বিকাশের উন্নয়নের জন্যই এই সিয়াম সাধনার বিধান দিয়েছেন। আজকের পৃথিবীতে স্বার্থপরতার যে দ্বন্দ্ব সংঘাত শুরু হয়েছে একমাত্র উপযুক্ত সিয়াম সাধনাই মানুষকে এসব থেকে বাঁচাতে পারে। আর তাতেই গড়ে উঠতে পারে সহমর্মিতার এক সুন্দর সমাজ।
আল্লাহ তৌফিক দিলে আমরা শুধু সারা দিন না খেয়ে থাকব না। আমরা রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবো। অর্থ বুঝে কোরআন অধ্যায়ন করবো। কোরানের সাথে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে মনোবল তৈরি করবো। সেই মনোবলকে পুজি করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করব।

লাইলাতুলকদর সম্পর্কে আলোচনা করা বাঞ্চনীয়।
রহমতের সওগাত নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে আসে রমজান আর সেই রমজান মাসের শেষ দশদিনে লুকিয়ে থাকে মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুলকদর। রমজানের শেষ দশদিনের বিজোড় রাতগুলোর যে কোন একটি লাইলাতুলকদর। আল্লাহতায়ালা চান আমরা এই রাতটি অনুসন্ধান করি। তাই শেষের প্রতিটি বিজোড় রাতেই আমাদের ইবাদতে মসগুল থাকা উচিত। আমরা যদি ২১,২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ তারিখ রাতেই আল্লাহর দরবারে ধরনা দেই তার মহিমান্বিত রজনীর রহমত পেতে, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি খুশি হবেন। হয়তো আল্লাহ তার বান্দার আন্তরিকতা লক্ষ করার জন্য এই রাতটি নির্দিষ্ট করার পরিবর্তে অস্পষ্ট রেখেছেন। কোরআনের বর্ননা অনুযায়ী এই রাতটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। দোয়া কবুলের এক বিশেষ সুযোগ। রমজান মাসের যে কোন তারিখেই এই রজনী হোক না কেন এ রাতযে নিশ্চিত এক মহিমান্বিত রাত এতে কোন ভুল নেই।
কদরের রাত এত সন্মানিত হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু কারন রয়েছে।
১। এই রাতে কোরআন শরিফ নাযিল করা হয়েছে।
২। এই রাতের নাম স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুলকদর লাইলাতুল মুবারাকাহ রেখেছেন।
৩। এই রাতের ফজিলত ও মহত্ব হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।
৪। এই রাতে সুর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর রহমত বর্ষিত হতে থাকে।
৫। এই রাতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারন করা হয়।
৬। এই রাতে একনিষ্ঠ ইবাদাতকারীর পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
৭। এই রাতে দোয়া কবুল হয়।
৮। এই রাতে অসংখ্য ফেরেস্তা ও জিব্রাইল (আঃ) পৃথিবীতে নেমে আসে এবং ইবাদতকারীদের ছালাম দেন, তাদের দোয়ার সাথে আমিন আমিন বলে থাকেন।
৯। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা ফেরেস্তাদের পয়দা করেন।
১০। এই রাতে জান্নাতে বৃক্ষ রোপণ করা হয়।
১১। এই রাতে আল্লাহর পদত্ত খেলাফত মহানবী (সাঃ) এর হাতে সোপর্দ করা হয়।
(সুবহান আল্লাহ)।

এই রাতে এতসব ঘটনা ঘটেছে বলেই এই রাতটিকে পরিপূর্ণ সন্মান ও শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কদরের রাত সমস্ত রাতের মধ্যে প্রধান ও শ্রেষ্ঠ।

আল্লাহ তায়া’লা বলেছেন, কদরের রাতটি হাজার মাস থেকে উত্তম। এই রাতে ফেরেস্তাগণ এবং জিব্রাইল (আঃ) তাদের প্রভুর অনুমতিক্রকে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে অবতীর্ণ হন। রাতটিতে সন্ধ্যা হতে সুভহে সাদিক পর্যন্ত শান্তি বর্ষিত হতে থাকে। (সূরা বাকারা)। সুবহান আল্লাহ।

আমাদের উচিত সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। কদরের রাত একটি বিশেষ রাত বলে এই রাতে আল্লাহর অফুরন্ত রহমত লাভ করা উচিত। এই রাতে আমরা পূর্বের কৃত পাপের জন্য ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করে আমরা পাপমুক্ত হতে পারি। আখিরাতের জন্য নেকীর ভান্ডার ভারী করতে পারি। যে এই রাতকে অবহেলা করেছে সে হতভাগা। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন , রমজান মাসে এমন রাত আছে যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রইল সে সম্পুর্ন বঞ্চিত রইল। (সুনানুন নাসায়ী- ২১০৬)
যে এই রাতে নিষ্ঠার সাথে ইবাদত করবে আল্লাহ তার পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের উদ্দেশ্যে কদরের রাতে ইবাদত করে তার পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করা হয়। (বোখারী)।

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা আসুন আমরা আল্লাহর কাছে কায়োমানে প্রার্থনা করি, তিনি পবিত্র রমজান মাসে আমাদের জন্য যে শ্রেষ্ঠ নিয়ামত পবিত্র কোরআন পাঠিয়েছেন আমরা যেন সেখান থেকে উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। নিজেদের জীবনে সেই শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারি। যেন নিজেদের সন্তানদের কোরআনের শিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। এই আজকের কলুষিত সমাজকে যেন কোরআনের ছাচে গড়ে তুলতে পারি। আল্লাহর পথে কোরবানি হওয়ার যোগ্যতা যেন অর্জন করতে পারি।
প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা আল্লাহর কাছে আরো পার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের তৌফিক দেন, আমরা কদরের রাতকে যেন আন্তরিকভাবে অনুসন্ধান করতে পারি এবং আল্লাহর ইবাদতে মসগুল থেকে তার অশেষ রহমত লাভ করতে পারি। আমিন

দিল আফরোজ রিমা

কবিও সাহিত্যিক

Leave A Reply

Your email address will not be published.