Take a fresh look at your lifestyle.

ইট রঙের বাড়ির টুকরো অংশ

335

“আপনার স্ত্রী কি প্রায়ই এমন ভয় পান?”
“জ্বি। ”
নাগিব বসে আছে সাইকোলজির এক প্রফেসরের সামনে। ভদ্র মহিলা সাইকোলজিস্ট প্লাস কাউন্সিলর। তার চোখ মহিলার টেবিলের উপর রাখা নেমপ্লেটের উপর। মহিলার নাম আফরিনা খান।
“নাগিব সাহেব! ”
“জ্বি! ”
“আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতো দিন আগে? ”
“দু বছর। ”
“প্রেমের বিয়ে? ”
“জ্বি না।”
“দুঃস্বপ্নে কী দেখে সে? ”
নাগিব হাত নেড়ে উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বলে, “তার কথা ছেড়ে দিন!এক এক বার এক এক রকম বলে! ”
“সত্যিই?ভালো করে মনে করে দেখুন। ”
নাগিব ভ্রূ কুঁচকায়।
“একটা ইট রঙের বাড়ির কথা বলে। ”
“ইট রঙের বাড়ি? ”
“জ্বি। আর তার সাথে এক এক বার এক এক রকম অন্য কিছু একটা যোগ হয়।”
“কী রকম? ”
“এই যেমন, কুকুরের কথা বলে। অনেক বড় বড় কুকুর। তারা কোথা থেকে আসে কোথায় যায় কেউ জানেনা। ”
“ইন্টারেস্টিং। ”
নাগিব ভালো করে মহিলার দিকে তাকিয়ে দেখে সে ঠাট্টা করছে কিনা। নাহ, সিরিয়াস মুখ বলেই তো মনে হচ্ছে।
“আর কিছু? ”
“একটা পুকুরের কথা বলে। মাঝে মাঝে কুয়ার কথা বলে। ঘন কুয়াশার কথা বলে। ওই..দুঃস্বপ্ন যেমন হয় আর কী!”
“উনি কি শুধু রাতেই ভয় পান?না কি দিনের বেলাও?”
“না, শুধু রাতেই।দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে ওঠে। তার ঘুম ভাঙানো যায় না,চিৎকারও থামানো অসম্ভব হয়ে যায়। ”
“কতো দিন পর পর হয় এটা?”
“আমি তো আর এতো খেয়াল করিনি.. ”
“অনুমান করে বলেন। ”
“মাসে দুই এক বার।”
“যেদিন এই ঘটনা ঘটে, সেদিন কি ঘুমাতে যাওয়ার আগে কোনো সমস্যা হয়?বা অন্য কোন লক্ষণ?কোনো অস্থিরতা তৈরি হয়?”
নাগিবকে খুব বিভ্রান্ত দেখা গেল। এক মুহূর্ত বিরতি দিয়ে সে বলে, “এটা তো আমি আগে কখনো লক্ষ্য করে দেখিনি! যে কয়েক বার এমন হয়েছে, তার আগে প্রতি বারই আমার সঙ্গে ওর ঝগড়া হয়েছে। ”
“তার মানে কী মাসে দুই একবার আপনারা ঝগড়া করেন?”
“সেটা কি খুব অস্বাভাবিক কিছু? ”
“বড়সড় ঝগড়া? ”
“নাহ, সেরকম কিছু না।”
“কথা কাটাকাটি? ”
“জরী সে রকম মেয়ে না।”
“তাহলে কীরকম মেয়ে? ”
“ও খুব শান্ত স্বভাবের। রেগে গেলে কথা বলা বন্ধ করে দেয়।চিৎকার চেঁচামেচি, ঝগড়াঝাটি ওর ধাতেই নেই। ”
“তিনি কি কোনো কিছু নিয়ে কষ্টে আছেন?”
“আমার জানা মতে নেই। ”
“আপনারা বেবির জন্য কোনো প্ল্যান করেছেন?”
“এক মিনিট। ”
নাগিব উত্তেজিত মুখে সোজা হয়ে নড়েচড়ে বসে।
“ম্যাডাম, আমি তো এটাও খেয়াল করিনি! গত এক বছর ধরে আমরা দুজন মিলে বেবির জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু হচ্ছে না। সে জন্য কি এমন হতে পারে? ”
“মে বি।অর মে বি নট।আপনি কিন্তু আমাকে অনেক কিছুই বলছেন না।এই যেমন, এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা স্কিপ করে গেছেন।”
“আসলে, বেবি নিয়ে আমি চিন্তিত না।আমরা দুজনেই ডক্টর দেখিয়েছি।কারো কোনো সমস্যা নেই। আমার মনে হয় না চিন্তার কিছু আছে। ”
“তার বয়স কতো বলেছিলেন?”
“পঁচিশ।আমি মনে করি না যে বেবি হওয়ার সময় পার হয়ে গেছে! ”
“তার সেরকম নাও মনে হতে পারে। এবং সেই সাথে তার উপর ফ্যামিলির অন্য মেম্বারদের প্রেশার থাকতে পারে। ”
নাগিবের মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে।
“এটাও তো আমি নোটিশ করিনি ম্যাডাম। লাস্ট টাইম একটা ফ্যামিলি গেট টুগেদার অনুষ্ঠানে এই ধরণের কথা বলা হচ্ছিলো।”
“কী ধরণের কথা? ”
নাগিব হাত নেড়ে উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বলে, “এই, আর কতো দিন হাওয়া খেয়ে বেড়াবে, এবার একটা বেবি নিয়ে নাও,এই ধরণের!”
আফরিনা তার দিকে ঝুঁকে এলো।
“নাগিব সাহেব! ”
“জ্বি। ”
“আপনি কিন্তু আপনার স্ত্রীকে সময় দিচ্ছেন না।”
“মানে? ”
“মানে, আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত? ”
“না ” বলতে গিয়ে থেমে যায় নাগিব।
“আমার কাছে মনে হচ্ছে আপনি আপনার কোনো সমস্যা নিয়ে প্রি অকুপাইড।”
“মানে? ”
আফরিনা তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বলে, “আমার সঙ্গে কথা বলার সময় আপনি আপনার ঘড়ির দিকে তাকিয়েছেন সতেরো বার।আমরা দুজন কথা বলছি চৌত্রিশ মিনিট সময় ধরে। সে হিসেবে আপনি প্রতি দুই মিনিটে একবার করে ঘড়ি দেখেছেন। ”
সে প্রতিবাদ করতে গিয়ে থেমে যায়।
“নাগিব সাহেব, আমি যদি আপনার সাথে দেখা করতে আসতাম, ওটার জন্য এতোক্ষণে আমি অপমানিত বোধ করতাম। ”
নাগিব চুপ করে থাকে।
“যদি আমি আপনার সাথে দেখা করতে আসতাম, তবে আমি তো এতোক্ষণে উঠে চলে যেতাম। ”
নাগিব কিছু একটা বলতে চেষ্টা করে। আফরিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার ব্যবহারে আমি মজা পেয়েছি,কারণ আমি তো আপনার সাথে কথা বলতে আসিনি। আপনি আপনার ইচ্ছা মত এসেছেন। এখানে অনেক টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে এক ঘন্টা সময় নিয়েছেন। সেই হিসেবে তাড়াহুড়ো করলে লস কিন্তু আমার না,আপনার। ”
নাগিব কী বলবে বুঝতে পারে না।
“শুধু তাই না, কথা বলতে বলতে আপনি আপনার ফোন বের করে আপনার টু ডু লিস্ট দেখেছেন। এটা কি আপনি বাসায়ও করে থাকেন?”
নাগিব এবার একটু রেগে যায়। “এটার সঙ্গে কি জরীর ভয় পাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে? ”
“থাকতে পারে। নাও থাকতে পারে। I’m just thinking about the possibilities. নাগিব সাহেব, আপনার স্ত্রী খুব সম্ভব ইন্ট্রোভার্ট প্রকৃতির মেয়ে কিংবা আপনার সাথে তার ভালো এটাচমেন্ট গ্রো করে নি।বিয়ের দুই বছর পরেও যদি কোনো চিৎকার করে ঝগড়া না করে কেউ কথা বলা বন্ধ করে দেয় তাহলে তো বিষয়টা সেই রকমই দাঁড়ায়।যেদিন যেদিন আপনার সাথে তার মনোমালিন্য হয়, সেদিন রাতে তার ইনসিকিউরড লাগে। তার ভয়টা আসে তার ফিলিং অফ ইনসিকিউরিটি থেকে। ”
“কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, আপনি কি বিষয়টা বেশি সিম্পলিফাই করে ফেলছেন না?”
“না,আমি এখনই কোনো কনক্লুশনে আসছি না।আপনি একবার তাকে নিয়ে আসুন। দেখে বলতে হবে। ”
“সেটা খুব টাফ হয়ে যায় ম্যাডাম। সে তো খুব সেনসিটিভ মেয়ে। ”
“ইন দ্যাট কেস আমি আপনার সাথে যেতে পারি কিংবা তার সাথে বাইরে কোথাও মিট করা যায়। ”
নাগিব একটু অবাক হয়ে যায়। “আপনি কি সবাইকেই এই সুবিধা দিতে পারেন?”
“না,আমার এতো সময় নেই। আমার নিজের ইন্টারেস্ট থেকে তার সাথে দেখা করতে চাই। কেন যেন আমার মনে হয় আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা মিস করে যাচ্ছেন। ”
এক ঘন্টা সময় শেষ। আফরিনা খান খুব প্রফেশনালভাবে বললেন, “তো, দ্যাটস অল ফর টুডে। ”
নাগিব উঠে দাঁড়ায়।
ঠিক বের হয়ে যাওয়ার সময় আফরিনা খান তাকে পেছন থেকে ডেকে বলেন, “নাগিব সাহেব! ”
নাগিব ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, “জ্বি? ”
“জাস্ট ওয়ান কোয়েশ্চেন।আপনার স্ত্রী কি অনেক কিছু আগে থেকে বলে দিতে পারেন যেটা পরে মিলে যায়? মানে ভবিষ্যৎ ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই বলে দিতে পারেন?”
নাগিবকে দেখে মনে হলো সে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেয়েছে।
“জ্বি ম্যাডাম, এরকম বেশ কয়েক বার হয়েছে! কোইন্সিডেন্স ভেবে আমি তো পাত্তা দেইনি!কিন্তু আপনি এটা কীভাবে জানলেন! ”
আফরিনা খান খুব সিরিয়াস মুখ করে বললেন, “মেয়েটির সঙ্গে কথা বলা দরকার। খুব জরুরি। ”
“জ্বি ম্যাডাম, আমি আপনার সাথে যোগাযোগ করে নেব।”
নাগিব বেরিয়ে যাওয়ার পর আফরিনা খান উঠে দাঁড়ায়। বেল টিপে তার এসিস্ট্যান্টকে ডাকে।
“জ্বি ম্যাডাম, ডাকছিলেন? ”
“আর কতোজন পেশেন্ট আছে? ”
“আর নেই। ”
“আমার ড্রাইভারকে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে বল।আমি আজকে ফিরবো না।”
এসিস্ট্যান্ট অবাক হয় না।এটা নতুন কিছু না।ম্যাডাম প্রায়ই এমন করেন।চেম্বারে থেকে যান।
এসিস্ট্যান্ট মেয়েটি বেরিয়ে গেলে তার টেবিলের এপাশে একটা সুইচে চাপ দিয়ে রুমের বাইরে লাগানো লাল রঙের বাতি জ্বালিয়ে দেয় আফরিনা। তার অর্থ হলো তার রুমে এখন আর কেউ ঢুকতে পারবে না। সে একা থাকতে চায়।
ও ফোন বের করে আনে। নাম্বার বের করে ডায়াল করে। ওপাশ থেকে একটা বিদেশি ভাষার কথা শোনা যায়।
“Sharlin’s speaking “, আফরিনা বলে।
কেউ জানে না যে এই আফরিনা খানের আসল নাম আফরিনা খান নয়।সে মুসলমানও নয়।এমনকি সে পুরোপুরি খাঁটি বাঙালীও নয়।আফরিনা খান তার ছদ্মনাম।
ওপাশ থেকে একটা বিদেশি ভাষায় প্রশ্ন ভেসে আসে। তার উত্তরে সে বলে, ” Yes, it’s the time. ”
ওপাশ থেকে কেউ প্রশ্ন করে, যার বঙ্গানুবাদ, “আজ থেকে নয় বছর আগে একটা মেয়ে ভ্রূণ ইমপ্লান্ট করা হয়েছিল। তার একটি ত্রুটি সারাতে পারা যায় নি।তুমি কি জানো সেটা কী ছিলো? ”
আফরিনা খান ওরফে শার্লিন অদ্ভুত একটা খসখসে গলার স্বরে বলে, “ট্রাইজোমি টুয়েন্টি ওয়ান।”
(বইয়ের নাম: “ইট রঙের বাড়ি ”
লেখক : মৌলী আখন্দ
প্রকাশক : পাললিক সৌরভ
প্রকাশকাল: বইমেলা ২০২০
প্রাপ্তি স্থান: রকমারি
মলাট মূল্য : ৩০০ টাকা

 

মৌলি আকন্দ- কবিও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.