Take a fresh look at your lifestyle.

স্বাধীনতা ও এক মেয়ের আত্মত্যাগের কাহিনী

82

 

এক গ্রামে ছিলো এক উচ্ছল কিশোরী
সারাদিন পুতুল সাজিয়ে বিয়ে বিয়ে খেলতো
একদিন সব ঘোর কাটিয়ে
পাড়াতো এক দাদী বললেন
ও ছুড়ি তোর বিয়ে
পুতুল খেলা বাদ দে,
বর আসবে এখনি
নিয়ে যাবে তখনি।

ক্ষীনকটির দ্যুতি ছড়ানো মেয়েটির চোখ মুখে
সেদিন অমাবস্যার ঘোর আঁধার নেমেছিলো,
বিয়ে কি! কিছু না বুঝতেই পুতুল সেজে
সে চলে গেল বরের বাড়ীতে,
সেখানকার কায়দা কানুন সব ছিলো তার অজানা
একটু জোরে হাঁটলেই মুরব্বীরা বলে উঠতো
“এই বউ, এত্ত জোরে হাঁটস কেন!
শন্দ করে হাসলেই বলতো
শব্দ কইরা হাসোস কেন!!
মাইয়া মাইনষের এত্ত জোরে হাসতে মানা!
এই কতাডাও দেহি
এই মাইয়াডার নাই জানা।”

মুখে উচ্ছল প্রাণ-খোলা হাসি নিয়ে
এক বুক স্বপ্ন নিয়ে যে মেয়েটি
পাড়ি জমালো নতুন জীবনে পথে
মনে ভীষণ মায়া ছিল
বুক ভরা ছিলো এক আকাশ স্বপ্ন!
বরের বাড়িতে সব না এর মাঝে
সব আবদারের একমাত্র ভরসা ছিলো তার বর।
মেয়েটির মুখে মিষ্টি এক চিলতে হাসির জন্য
যুবকটির চেষ্টায় আর
আন্তরিকতায় কোনো ত্রুটি ছিলো না।

একাত্তরের মার্চে
সেই মেয়ের বর ঘর ছাড়লো,
ঘর ছাড়ার সময় বউটারে কাছে নিয়ে বললো
“ও বউ সুন্দর করে হেসে বিদায় দাও
তোমার ঐ হাসিই যে আমার শক্তি।”
মুখে হাসি অন্তরে কান্না রেখে
বিদায় জানালো তার প্রিয়তম বরটিকে।
যুবকটি রাতের আঁধারে গ্রাম ছাড়লো;
সংসার কি করে হয় বোঝার আগেই
মেয়েটি ভীষণ একা হয়ে গেলো
সারারাত খুব করে কাঁদলো,
তার রক্ত লাল চোখে আগুন খেলা করলো
ব্যথাতুর হৃদয় আর চোখ ভরা জল নিয়ে
বরের ফিরে আসার পানে করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।

প্রায় একমাস পরে খবর এলো –
যুবক মুক্তিবাহিনীর সদস্য হয়ে বেশ
বাড়িতে পাকিস্তানি হায়েনার দৃষ্টি পড়লো,
একদিন গ্রামে মিলিটারি এলো,
মেয়েটিকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো
শাপলা-ফোটা পুকুর রক্ত জবার মতো লাল হলো!
সেই মুক্তিযোদ্ধার অতি প্রিয় নববধুকে মিলিটারিরা জিপে তুলে নিলো,
রাইফেলের বাটের আঘাতে,
কেউ কিচ্ছুটি বলতে পারলো না।
সদ্য কৈশোরে পা দেয়া মেয়েটি তার সম্ভ্রম হারালো
কে জানতো! আর কোনোদিন বরের দেখা পাবেনা
তাই বুঝি চিৎকারে আকাশ পাতাল বিদীর্ণ হলো
কই তুমি!!
আমারে বাঁচাও।
কিন্তু সেই চিৎকার যুবকের কানে পৌঁছাতে অনেক দেরি
যুবকের
সেই হায়েনার দল বাড়িঘরে আগুন দিলো
সবকিছু পুড়ে ছাই হলো।
তার নববধু সম্ভ্রম হারালো।
ছটফট করে প্রাণও গেলো।

রণাঙ্গনে খবর এলো –
খবর শোনার সময় নেই যুবকের;
যুবক তখন দেশ স্বাধীনের ব্রতে কঠিন কর্তব্যেরত।

১৬ই ডিসেম্বর
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো
একটি নতুন ভূখণ্ড হিসেবে
বাংলাদেশ নাম লিখলো মানচিত্রের বুকে।

কিন্তু সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব যুবক
ফিরলো যখন আপন ভিটেয়,
শূন্য ভিটায় পোড়া মাটির গন্ধ শুকলো
প্রেয়সীর পুড়ে যাওয়া শাড়ীর আঁচলে মুখ বুজে রইল,
আকাশ-বাতাস আর বৃক্ষরাজির আহাজারিতে
চারপাশের আকাশ বাতাস ভারী হলো –
যুবক চিৎকার করে কাঁদলো!

অশ্রুসিক্ত নয়নে যুবক
লাল সবুজের পতাকা তুললো
দেশের মাটিতে।

 

তাওয়াব নূর – কবি ও সাহিত্যিক, পঞ্চগড়। 

Leave A Reply

Your email address will not be published.