Take a fresh look at your lifestyle.

উপহার

32

 

আজকের বিষণ্ন বিকেলটায় একটু বেশি একাকী লাগছে শায়লা রহমানের। আর কতদিন! দেখতে দেখতে সময় চলে গেল। পঞ্চাশ বছরের সংসার জীবন কিভাবে কেটে গেল দুজনের তারা নিজেরাও জানেনা। ছেলে কানাডায় আর মেয়ে লন্ডনে তারা যার যার মতন স্হায়ী হয়ে গেছে দুইদেশে। হয়তো একসময় বাবা মাকেও নিয়ে যাবে। এমনটাই কথা চলছে, কিন্তু তাদের কাছে নিজের দেশ জন্মভূমি বড্ড বেশি আপন। দেশের মায়া তারা ত্যাগ করতে চায় না। এভাবেই চলছে তাদের জীবন। দুজন বুড়োবুড়ি মিলেমিশে একে অন্যের সহযোগী হয়ে বেশ ভালোই আছে। সারাদিনে দুটো ছুটা বুয়া এসে তাদের সব কিছু করে দিয়ে যায়। সকালের বুয়াটা একটু বয়স্ক, বিকেলেরটার বয়স কম বেশ চালাক চতুর হাসি খুশি অনেক কথা বলে। শায়লা রহমানের ভালোই লাগে ওর নাম হাসি। নামের সাথে ওর চরিত্রের অনেক মিল সত্যি সত্যি ও খুব হাসে।

আজ হঠাৎ করে চশমাটা ভেঙ্গে যাওয়ায় শায়লা রহমানের মনটা খুব খারাপ। তার স্বামী চশমাটা ঠিক করতে বাইরে গিয়েছে আর সে বসে আছে দখিনের বারান্দার দোলনায়। দখিনের ঝিরিঝিরি বাতাসে একটু করে দোল খেলতে খেলতে মনে মনে নানা কিছু ভাবছে। এমন সময় বিকেলের ছুটা বুয়া হাসি এসে উপস্থিত। আজকে হাসির মুখে কোন হাসি নেই। শায়লা রহমান হাসির এমন মনমরা চেহারা দেখে প্রশ্ন করলো কিরে তোর মুখে হাসি নেই কেনো? কি হয়েছে তোর? খালা আমি সকালে যে বাসায় কাজ করি ঐ বাসার খালার পোলার বিয়া অনেক বড় চাইনিজ হোটেলে। আমাদের দাওয়াত দিছে,যাইতে কইছে, কিন্তু আমরা কেমনে যামু এত বড়লোকের পোলার বিয়াতে। সেই সামর্থ্য কি আমাগো আছে। আমার মাইডা খুব তাল করতাছে হে নাকি যাইবো। কন খালা হেইডা কি করে সম্ভব? আমাগো মতন গরিব মানষের হেই দাওয়াত খাওয়া সাজে বলেন? ঐ খালা কইছে তোদের কিছু দিতে হবে না তোরা এমনি আসবি। কিন্তু তাই কখনও অয়! এক্কেবারে খালি হাতে তাই যাওন যায় বলেন?

শায়লা রহমান অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললো হাসি তুই চিন্তা করিস না তোরা পরিবারের সবাই দাওয়াতে যাবি। আমি সব ব্যবস্হা করে দেব। এটা শোনা মাত্র হাসি দৌড়ে এসে শায়লা রহমানের পায়ের কাছে বসে বলছে, খালা আমি চিন্তাও করবার পারতাছিনা আমাগো দাওয়াত খাওয়া অইবো। শায়লা রহমান একটু তাড়া দিয়ে বললো যা সব কাজ করে আমাকে এক কাপ চা দিয়ে যা। হাসিরএযেন আনন্দএমনে ধরছে না। হাসি ওর বস্তির বাসায় ফেরার সময় ভাবতেও পারছে না সত্যি ওরা চাইনিজ হোটেলে খেতে যাবে? তাও আবার এত বড় লোকের ছেলের বিয়েতে। একদিকে হাসির বুকভরা আনন্দ। অন্যদিকে শায়লা রহমান ফিরে গিয়েছে তার অতীত জীবনে যখন ছেলে মেয়ে ছোট ছিলো আত্মীয়স্বজনের বিয়ে জন্মদিন যে কোন অনুষ্ঠানে তারা কতো আনন্দ করে যেত। ছেলে মেয়ে দুটোর কি আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখে মন ভরে যেত। ছেলে মেয়ে দুটো কোন জামা পরবে মেয়ে কিভাবে চুল ঝুটি করবে কতো কতো স্মৃতি মনের মধ্যে খেলা করে গেল শায়লা রহমানের।

আগামীকাল শুক্রবার হাসি অস্হির হয়ে উঠেছে সারারাত ঘুম হয় নাই। সিনেমা নাটকে এমন বিয়ের দৃশ্য দেখেছে। বাস্তবে কোনদিন দেখে নাই। এই জীবনের প্রথম সরাসরি দেখবে চামচ দিয়ে খাবার খাবে নানা চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে? সেই সাথে ভেতরে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করেছে। আজ বিকেলে কাজে আসতেই শায়লা রহমান বলে দিলো আগামীকাল তুই গোছল করে তোর স্বামী ও বাচ্চাদের রেডি করে আমার বাসায় চলে আসবি। আর আমি তোকে রেডি করে দেব। পরেরদিন হাসি ছেলে মেয়ে স্বামী সবাইকে রেডি করে সোজা শায়লা রহমানের বাসায় হাজির। শায়লা রহমান তার হাজবেন্ডকে দিয়ে চমৎকার দুইখানা বই কিনে একটা ফুলের দোকান থেকে গোলাপ ফুল দিয়ে প্যাকেট করে উপহার রেডি করে নিয়ে আসলো। শায়লা রহমানের স্বপ্ন ছিলো ছেলে মেয়ের বিয়ের পর শায়লা রহমানের ইয়ং বয়সের সব শাড়ি ছেলের বউ ও মেয়েকে দেবে। কিন্তু তারা তো বিদেশে চলে গিয়েছে। তাদের আর শাড়ির তেমন প্রয়োজন নাই। তাই তার নিজের একখানা সুন্দর শাড়ি হাসিকে পরিয়ে দিয়ে বললো আজ এই শাড়িটা তোকে উপহার দিলাম। শায়লা রহমান খুব সুন্দর করে হাসিকে সাজগোজ করিয়ে হাসির খোঁপায় বেলী ফুলের মালা জড়িয়ে দিলো। যেমন করে শায়লা রহমান নিজে সাজগোজ করে অনুষ্ঠানে যেত। আয়নার সামনে গিয়ে হাসি নিজেকে দেখে যেন চিনতে পারছে না, হেসে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে। ওর হাসি দেখে শায়লা রহমানের মন খুশিতে নেচে উঠলো।

শায়লা রহমান উপহারের প্যাকেটটা হাসির হাতে দিয়ে বললো যাও গেটের সামনে আমাদের গাড়ি ও ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে, ও তোমাদেরকে নিয়ে যাবে এবং দাওয়াত খাওয়া শেষ হলে নিয়ে আসবে। হাসি যেন আনন্দে আত্মহারা। এবং উপহারের প্যাকেটটা হাসির হাতে দিয়ে বললো তুমি উপহারটা সরাসরি বরবধূর হাতে দেবে। তখন হাসি বলছে খালা কিছু লিখতে অইবো না। শায়লা রহমান মৃদু হেসে দিয়ে বললো কোন কিছু লিখতে হবে না। যা লেখার আমি লিখে দিয়েছি। ওরা খুব আনন্দ নিয়ে গাড়িতে উঠে উপরের দিকে তাঁকিয়ে হাত নেড়ে শায়লা রহমানকে বিদায় জানালো। শায়লা রহমান বারান্দায় দাঁড়িয়ে অশ্রু সজল চোখে ওদের যাওয়া দেখতে লাগলো, আর মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলে শুকরিয়া জানালো। হঠাৎ শায়লা রহমানের স্বামী হামিদুর রহমান পেছন থেকে ডেকে বললো, বাবুর আম্মা দেখেছো, কতো সহজে আমরা একটা সুন্দর সময়, সুন্দর দিন, সুন্দর মূহুর্ত একজন আরেক জনকে উপহার দিতে পারি।

 

 

ইসরাত জাহান – গল্পকার ও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.