Take a fresh look at your lifestyle.

খেয়া মাঝি – পর্ব- এক

82

 

সারা দিন মাছের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি মাছ বিক্রি করে মাত্রই বাড়ি ফিরেছে লক্ষী। এমন সময় কিসের যেন হট্টগোল শোনা যায়। জেলে পাড়ারই কয়েকজন কিশোর লক্ষীর উঠানে এসে দাঁড়াল। একজনের কোলে একটি বাচ্চা, লক্ষী এগিয়ে যায়। দেখে বাচ্চাটি তার নিজের তিন বছরের ছেলে। লক্ষী জানতে চায়, কিরে গোবিন্দ আমার রামের কী অইছে ?
গোবিন্দ ভয়ে ভয়ে বলে, চাচীগো রামরে বুঝি আর বাঁচাইবার পাড়লাম না। আমিতো খেয়া পাড়ে ব্যস্ত আছিলাম। একবার পাড়ে নৌকা ভিরানোর সময় মনে অইল পানিতে কিছু একটা লাফালাফি করতাছে। বেশি পানি না। খেয়াল কইরা দেখলাম, ছোট পোলাপাইনের মত মনে অয়। আমি নৌকায় একজনেরে ডাইকা লই। তারপর নিজে পানিতে নাইমা বাচ্চাডারে তুলবার চ্যষ্টা করি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দূরে ভাইসা গেছে। তহন আমার লগে আরো দুই তিনজন ডাইকা লইলাম। অনেকক্ষণ ধইরা খুঁজাখুঁজি করি। হের পর হঠাত আমার পায়ের কাছে কিছু আন্দাজ করি। তুইলা দেখি ও আর কেও না, আমাগো রাম। ওর বুকের মধ্যে কান লাগাইয়া দেখলাম কোন শব্দ নাই।

লক্ষী ছেলেকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে। বাচ্চাটি সত্যিই বেঁচে নেই। প্রচুর পানি পেটে ঢুকেছে। অনেকক্ষণ পানিতে থাকায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেছে। লক্ষীর আর্তচিতকার ছড়িয়ে পড়ে সারা পাড়ায়।

দিনের প্রায় শেষ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। জেলে পাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে আলতো আলোর প্রদীপ জলছে। ভেসে আসছে তুলসী তলার শাঁখের ধ্বনি। এমন সময়ে ছোট রামকে চিতায় নিয়ে যাওয়া হলো। খানিকটা দূরে গ্রামের মেঠু পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টার ঘনশ্যাম। দাউ দাউ করে আগুন জলতে দেখে তিনি ভাবেন, জেলে পাড়ায় বুঝি আবার কেউ মারা গেল। যাই, গিয়ে দেখি।
ঘনশ্যাম মাষ্টার কিছুটা পথ হেঁটে ওখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কে মারা গেলরে সোনাই ?
সোনাই চোখের জলে ভেসে জবাব দেয়, মাষ্টার মশাই আমার কপাল পুইরেছে। আমার ব্যাটা আইজ পানিতে ডুইবা মরল। তারেই জালাইয়া দিলাম।
মাষ্টারমশাই দীর্ধ নিশ্বাস ফেলে বলেন, আফছোস করিস না সোনাই সবই তার ইচ্ছে। নদীর পাড়ের মানুষের কাছে নদী অনেক পরিচিত। ছোট শিশু নদীর কুলে কাদা মাটি মেখে খেলাধুলা করে বড় হয়। ছোট বেলা থেকেই নদীর সাথে তাদের ভাব গড়ে উঠে। শিশুরা সাঁতার কেটে নদীর এপার থেকে ওপারে যেতে পারে। তাই নদী নিয়ে কারো মনে কোন ভয় নেই। তবে এই নদীর বুকে কত ছোট শিশু, কত বৃদ্ধ নারী প্রাণ দিয়েছে,তার হিসাব কে রেখেছে। নদীর শান্ত অবস্থায় এই সব ঘটনা ঘটে থাকে। আর নদী যখন বর্ষার ডাকে ভয়ংকর আকার ধারণ করে, ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব কিছু, সে কথাতো বলাই বাহুল্য। তাই আমরা নদী পাড়ের মানুষ হলেও বর্ষার মৌসুমে অন্তত বাচ্চাদের একটু সাবধান রাখা দরকার।

গোবিন্দের মনটা ভালো নেই। সারা দিন খেয়া বেয়ে রাতে বাড়ি ফিরে কারো কান্নার শব্দ শুনতে পায়। শব্দটা তার ভীষণ পরিচিত। তাই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে, হায় ভগবান আমার দিদির কপালে কি কোনদিন সুখ অইব না। জীবনডা কি তার কাইন্দা কাটাইতে অইবো। সে কোন কথা না বলে সরাসরি ঘরে গিয়ে মাকে বলে, মাগো, ভাত দে। ম্যালা ক্ষিদা পাইছে। সকালে পান্তা খাইয়া গেছি। সারা দিন খেয়া বাইছি। তারমধ্যে আবার রামডা মইরা গেল। ভালই লাগে না, আর কিচ্ছু ভালো লাগে না মা।

মা কাবেরী বলে, তাতো বুঝলাম। তোর দিদিযে বিলাপ কইরা কানতাছে তোর তা চোকে পড়ে না ?

চোকে পড়ছে মা, বাড়ি ঢুকনের আগেই দিদির কান্দন আমার কানে আইছে। আর বুঝবারও পারছি দিদিরে জামাইবাবু আবার মাইর ধইর করছে। আবার ট্যাকা-পয়সা চাইছে। আমি কি করুম মা। সারা দিন খেয়া বাই। যা পাই তোমার কাছে দেই। আমার ফাঁসি লইয়া মরতে অইবো।

অলইক্ষা কতা কস ক্যান। ভাগ্যে যা আছে তা অইবো। তোর দিদি আর ঐ বাড়ি যাইবো না। আর মাইরও খাইবো না। তোর জামাইবাবু আর নাই। মাছ ধরতে গিয়া সাপের কামর খাইছে। ওঝা ডাকতে ডাকতে সারা গায়ে বিষ ছড়াইয়া গেছে। ওঝা অনেক চেষ্টা করছে তয় কোন কাম অয় নাই।

গোবিন্দ আশ্চর্য হয়ে বলে, মা এইডা তুমি কি কও, জামাইবাবু নাই ? ও দিদি আমারে খবর দিবি না ? তুই কেমনে খবর দিবি ? আমরা বেজায় গরিব বুইলা তোর শ্বউর বাড়ির মানুষ আমাগরে মানুষ মনে করে না। আমার জামাইবাবু মইরা গেছে আর আমারে কোন খবর দিওনের দরকার মনে করে না। দুঃখ করিস না দিদি, ভাগ্যে যা আছে তাতো অইবোই।

কাবেরী পিরাটা এগিয়ে দেয়। একটি থালায় ছেলের জন্য কয়েকটি রুটি আর পাশে খানিকটা মরিচবাটা রেখে বলে, আয় বাবা রুটি কয়খান মুখে দে।

গোবিন্দ ভাবছে, বিধবা মা আর নিজের খাবার যোগাড় করতে পারে না সে। কোন দিন দুই বেলা খাবার জোটে, কোনদিন একবেলা খেয়ে খেয়া বাইতে হয়। খেয়াপাড় হয়ে লোকজন ঘাটে ঠিকমতো পয়সা জমা করে না। সেই বাকি পয়সার জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হয়। এক টুকরো জমি ছিল তা বিক্রি করে তার দিদির বিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিয়ের পরেও কয়েকবার ধার দেনা করে জামাইবাবুকে টাকা দিতে হয়েছে। সেই ঋণ বহু কষ্টে গোবিন্দ শোধ করেছে। এখন দিদি বাড়িতে চলে এলো। গোবিন্দ তিন জনের খাওয়া পরা কিভাবে চালাবে সে চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠে। কাবেরী আবার ছেলেকে খাবার খেতে তাড়া দেয়। কিন্তু গোবিন্দ জানায় তার আর ক্ষুদা নাই।

বারান্দায় খেজুর পাতার মাদূর বিছিয়ে নেয় গোবিন্দ। ঘরে ভাঙা সিন্দুকটার ওপর থেকে একটা আধাময়লা কাঁথা আর তেল চিটচিটে একটি বালিশ তুলে নেয় সে। খেজুর পাতার মাদূরের ওপর কাঁথাটা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে।

সকাল বেলা খেয়া পারাপারের সময় আনন্দ মিস্ত্রিকে খাটে শুইয়ে খেয়া পার করা হয়। তাই গোবিন্দ জিজ্ঞেস করে, আনন্দ দাদার পা খান বুঝি আর ভালা অইল না।
আনন্দ মিস্ত্রির ছোট ভাই কানাই ভারাক্রান্ত কন্ঠে বলে, নারে গোবিন্দ, কী একখান পেরেক পায়ে ফুটল,সেই থিকা বেদনা। পা ফুইলা গেলো। অহনতো অর্ধেক পা পইচাই গেছে। ফটিক ডাক্তার ম্যলা অসুধ খাওয়াইল, কোন কাম অইলো না। পায়ের কষ্টে দাদা এনম কান্দা কাটি করে। হের চিল্লানিতে কারো ঘুমাইবার সাধ্য থাকে না। দেখি সদরের হাসপালে নিয়া। ভাইরে, জমি জিরাত যে টুক আছিল দাদার পায়ের পিছনে সব গেল।

 

দিল আফরোজ রিমা- কবি, সাহিত্যিক ও লেখক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.