Take a fresh look at your lifestyle.

নতুন টিনের ঘরখানা

47

 

গেল বছর নতুন টিন দিয়া ঘরখান বানাইছিলাম। এ বাড়ি ওবাড়ি কাম কইরা একখান একখান কইরা পয়সা জমাইছিলাম। যেমুন কইরা পানি বাড়তাছে আল্লাহই জানে ঘরখান বাঁচাইবার পারমো কিনা- বৃদ্ধ মালেকা ভানু একা একাই কথাগুলো বলতে থাকে। হঠাৎ তার খেয়াল হয় অনেক বেলা হয়েছে। এবারও বিড়বিড় করে বলে -ম্যলা বেলা অইছে কয়খান ভাত না রানলে খামু কি?
একলা মানুষ, মাইয়াডা ছাড়া তিনকুলে মোর আর কেউ নাই। আহা এমন বর্ষা কালে আমার তিন বছরের পোলাডারে বানের পানিতে ভাসাইয়া নিল। অইতো দুই বছর আগের কতা- বাড়িঘর ভাইসা গেল বানের পানিতে। হেই সময় আমরা কেমনে পরান বাঁচামো, চিল্লাইয়া কান্দি আর কই আমাগো বাঁচাও। একখান নাও আইল জুয়ান দুইডা পোলা আমাগো নায়ে তুলনের লাইগা হাতখান বাড়াইয়া দিল। আমার সোয়ামি বুইরা মানুষ পানিতে পইড়া ম্যলা পানি খাইল। হেই পানি খাইয়া ডাইরিয়া অইল। আশ্রয় কেন্দ্রে কয়দিন ভুগল, একদিন মইরা গেল।
পাঁচ বছর আগে মাইয়াডারে বিয়া দিলাম দূর দেশে। মাইয়া আমার সংসারী অইছে। বছরে এক দুইবার মায়েরে দেইখা যায়। আমি একলা পইড়া থাকি বিরান ভুমিতে। বাড়িডার লগেই একখান পালান আর এক চিলতা জমি আছে। আমার ভাসুরের পূলাডা চাষ করে আমারে কিছু দেয়। বাড়ির নারকুল গাছ আর খেজুর গাছের পাতা দিয়া পাটি বানাই। আমার পাটি জব্বর সুন্দর অয়। তাই দেইখা মানুষ বাড়ি বইয়া কিনে নেয়। খুশি অইয়া যা দেয় তাতে আমার বছরের দুইখার মোটা কাপুড় তেল নুনের খরচ অইয়া যায়। একলা বাড়িতে থাকি তাও বাঁচবার চায় এই পোরা মনডা। মরনের বয়স অইয়া গেছে কবেই। তাও স্বপন দেখি পোরা চক্ষে। প্রতি বছর আমাগো নদীর পারের মানষের ঘর বাড়ি ক্ষেত খামার হালের গরু সব ভাসাইয়া লইয়া যায়। আমরা ফের স্বপন দেখি নতুন কইরা কত কষ্টে ঘর বান্ধি। নতুন কইরা বাঁচবার স্বপন দেখি। সরকারের কাছে থিকা ধার দ্যনা কইরা জমিতে আবার বিজ ছড়াই। নতুন ফসলের আশায় বুকখান বাইন্দা কাম কাইজে মন দেই। এমনি কইরা পার অইল জীবনের কত্তডা সময়। হাড়াইলাম কত্তকিছু। এই অবস্থায় সাধ অইল নতুন টিন দিয়া ঘর বানামো। হ মানুষ বুঝি এমনই অয়।
অচাচী, চাচীগো-।
হাক ডাক করে বাড়িতে ঢুকে কলিমউদ্দিন। মালেকা ভানু বাইরে এসে বলে- কি অইছে বাজান।?
কলিমউদ্দীনের চোখে চিন্তার আভাস। সে বলে- -চাচীগো, বানের পানি খুব জুরে আইতাছে। আমাগো বাড়ি সকলের বাড়ির চাইতে উচা। তয় এক ঘন্টার মধ্যেই বাড়িতে পানি উঠবার পারে। চাচি ব্যবাক ডুইবা যাইতাছে। তুমি চাইল ডাইল যা আছে কাপুরে গাট্রি বাইন্দা রাইখো। আমরা কাইল সকালে নায়ে উঠুম।
-যাবি কোতায়?
-তা জানিনা। দুইখান আশ্রয় কেদ্র ডুইবা গেছে। আমরা নায়ে উইঠা খুইজা লমু কোনহানে থাকবার পারি হেই জায়গাডা। আল্লায় যে ধারে নেয় হেই ধারেই যামু চাচি।
-আমি যামু নারে কলিম। তোরা যা। আমার নতুন টিনের ঘরডা থুইয়া আমি কোনহানে যামু।
-চাচি পানিতে ভাইসা যাইবাতো। পাগলামি কইরো না।
সারাদিন মালেকা ভানুর রান্না খাওয়া কিছুই হলো না। সে শুধু ভাবছে তার নতুন টিনের ঘরটি কিভাবে বাঁচাবে। তার মনে পূনরাবৃত্তি হচ্ছে সারা জীবনে ঘটে যাওয়া কত গল্প। এক সময় মনে হলো জোয়ান বয়সে সে কত সুন্দরী ছিল। মা বাবা খুব শখ করে নাম রেখেছিল মালেকা ভানু। মাইক বাজিয়ে বাদ্য বাজিয়ে কত আনন্দ করে বিয়ে দিয়েছিল। স্বামী তাকে কত ভালবাসত। শাপলার ফুল এনে খুপায় গুজে দিত। দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে স্বামী নিয়ে সুখেই কাটছিল দিন। আগেতো এত বন্যা হতো না। হলেও এতটা ভয়াবহ ছিল না। পানি বাড়ি ছুই ছুই হত কখনো বাড়িতে পানি ঢুকতো না। এক সময় শুরু হলো বানের পানির তান্ডব। কেরে নিল বুকের ধন। সেই সময় থেকে প্রতি বছরই আগের বছরের চেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়। এবার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
মালেকা ভানুর ঘরে বুক পানি সকাল হওয়ার আগেই। ফজরের আজান হলো। তার সাথে সাথেই কলিম নৌকা নিয়ে এসে ডাকছে। – অ চাচি বাইর অও আর সময় নাই।
মালেকা ভানু তার নতুন টিনের ঘর ছেরে কিছুতেই যাবে না। কলিমউদ্দিন কোন উপায় না দেখে অনেক কষ্টে জোর করে চাচিকে নৌকায় তুলে নেয়।
নৌকা চলছে। চলতে চলতে দিন শেষ হয়ে সন্ধার আগে একটি আশ্রয় খুঁজে পায় তারা। চট দিয়ে কোন রকমে মাথা গুজার ব্যবস্থা করা হলো। সাথে যা ছিল চাউল ডাল তা দিয়ে বহুকষ্টে আগুন জালিয়ে পাতলা করে খিচুড়ি রেধে চলল সপ্তাহ খানিক। বৃষ্টিতে ভিজে দূষিত পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ল মালেকা ভানু এবং কলিমউদ্দিনের দুই ছেলে হাসু মিসু।
বর্ষাকালে বৃষ্টি বাদলের মধ্যে রাস্তার জীবন যে কতটা নিন্মমানের তা ভুক্তভোগী ছাড়া বুঝা সম্ভব নয়। এতো মানুষের জীবন নয়, পশু-পাখির জীবন। তাই অসুস্থ হবে এটাই স্বাভাবিক। সরকার ত্রাণ দিচ্ছে কিন্তু সে ত্রাণ কোনভাবেই কলিমউদ্দিনের কাছে গিয়ে পৌছায় না। এক জন একজন করে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ল।
মালেকা ভানুর হুস নেই। সে শুধু বলেই যাচ্ছে- আমার নতুন টিনের ঘরখান -।
এমন অবস্থায় কেটে গেল আরো এক সপ্তাহ। মালেকা ভানু তার সাধের নতুন টিনের ঘরের মায়া কাটিয়ে চলে গেল না ফেরার দেশে। চলে গেল কলিমের বড় ছেলে হাসুও। কবর দেওয়ার কোন জায়গা নেই। তাই বানের পানিই বয়ে নিয়ে গেল তাদের পরপারে।

 

দিল আফরোজ রিমা- কবি ও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.