Take a fresh look at your lifestyle.

স্মৃতিময় মাহে রমজান

181

 

শৈশবের রোজার স্মৃতি মনে করতেই চোখের পাতা ভিজে উঠল।কারণ আমার শৈশবের অলিতে-গলিতে সর্বত্র যার বিচরণ তিনি হচ্ছেন আমার দাদীজান।আজ অনেক বছর হতে চলল দাদীজান আমাদের মাঝে নেই,কিন্তু উনার রেখে যাওয়া স্মৃতি, উনার স্পর্শ অনুভবে অমলিন। আর রোজা মানেই আমাদের কাছে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের বাইরে একটু অন্যরকম।

আব্বার চাকুরির সূত্রে যেহেতু আমরা ঢাকা থাকি আর দাদী গ্রামের বাড়িতে তাই রোজা আসা মানে জানতাম,গ্রাম থেকে দাদী আসবেন, পুরো রমজান জুড়ে আমাদের সাথে থাকবেন। এটা ছিল আমাদের জন্য বিশাল প্রাপ্তি।

যথাসময়ে দাদীজানের আগমন ঘটতো আমাদের বাসায়, আর তার সাথে সাথে ঘরে ঢুকতো বিশাল বিশাল কিছু পোটলা। আমরা যেমন দাদীজানকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হতাম তেমনি দাদীজানও আমাদের পেয়ে প্রান ফিরে পেতেন। দাদীজানের সাথে নিয়ে আসা সেই পোটলাগুলোর আকর্ষণও কম ছিল না। ওগুলো খোলার জন্য দাদীজানকে অস্হির করে তুলতাম। একসময় উনি এগুলো খুলতে বসতেন,আর আমরা অবাক চোখে দেখতাম, কি নেই তাতে -ঘরে ভাজা মুড়ি, মুরকি,বিভিন্ন পিঠা, মিষ্টি আলু, চিনাবাদাম, নারিকেল, শিমের বিচি, বাদাম-তিল-গমের তৈরি এক ধরনের সুস্বাদু ছাতু, সিজন অনুযায়ী ফলফলাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। পুরো বাড়িটা যেন মুঠোয় করে নিয়ে আসতেন দাদী।

এভাবেই শুরু হতো আমার শৈশবের রমজানের প্রথম পর্ব। রোজা শুরুর দশ-বারো দিন আগে থেকেই প্রস্তুতি চলতো। ঘরদোর পরিস্কার, কাপড়চোপড় ধোঁয়া, রোজার বাজারঘাট করা, একটা রমরমা ব্যাপার ছিল। আব্বাকে দেখতাম, পুরো রমজানের শুকনা বাজার একসাথে নিয়ে আসতেন। মা সেগুলো ঝেড়ে বেছে রোদে শুকিয়ে পটে পটে গুছিয়ে রাখতেন।

ঠিক কবে থেকে রোজা শুরু করেছি খুব একটা মনে নেই। তবে আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি সেসময়কার স্মৃতি বেশ তাড়া দেয়। আমরা তখন তেজগাঁও সরকারি আবাসিক এলাকায় থাকি। প্রতিষ্ঠানটি ছিল সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সরকারি শিশু পরিবার। এখানে ৮/১৩বছর বয়সি প্রায় ২০০ শিশুর বাস। আমার শৈশবে ওদের সাথে খেলা -ধুলা করে কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। তো দেখতাম ঐ ছোট ছোট মা-বাবা হীনা মেয়েদের রোজা নিয়ে বেশ আগ্রহ ও নানা পরিকল্পনা। মূলত ওদের দেখেই রোজা পালনে আগ্রহী
হওয়া।

সেবার দাদীকে ঘুমের আগে খুব করে বলে রেখেছিলাম সেহরিতে যেন ডেকে দেয়। কিন্তু দাদী ডেকে দেয়ার আগেই জেগে ওঠেছিলাম।কারন আমাদের আবাসিক ভবন ঘেঁষাই ছিল মেয়েদের আবাসিক হল। ঘুমের ঘোরেই শুনতে পেলাম অনেক কন্ঠের কলকাকলি, প্লেটের টুংটাং শব্দ। জেগে ওঠে দেখতে পেলাম রাতের আঁধার ভেদ করে সবগুলো বাসায় আলোর ঝলকানি। কেমন উৎসব উৎসব ভাব সর্বত্র।

যথাসময়ে সেহরি খেতে বসলাম। খাওয়ার চেয়ে উত্তেজনাই বেশি ছিল। দাদীজান বললেন, শুন দিদিভাই সেহরি খাওয়াও অনেক সওয়াব। আর রোজা রাখলে কি করতে হয় জানতো? মিথ্যা কথা বলা যায় না, ছোটদের বকা দেয়া যায় না, মারা যায় না। মনে আছে, একদিকে রোজা রাখার উত্তেজনা অন্যদিকে রোজা যাতে হালকা না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখা। সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম ওযু করার সময় গড়গড়া করতে। সকাল বেলাটা ভালোভাবেই পার করেছি কিন্তু দুপুর গড়াতেই পানি পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ, পেটে ইদুর দৌড় শুরু হতো। খাবারের তাগিদ অনুভব করতাম বেশ। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো দুপুরে হুজুরের কাছে আরবী পড়তে। হুজুর চলে যাওয়ার পর মা বুঝতেন খুব কষ্ট হচ্ছে। সময় পার করানোর জন্যই কিনা জানি না, মা বলতেন, যাও নিচে থেকে ঘুরে এসো। ছোটদের নিয়ে নিচে চলে যেতাম। এদিকে দুপুর থেকে চলত রান্নার আয়োজন। মা সন্ধ্যা আর সেহরির রান্না শেষ করে ব্যস্ত হয়ে যেতেন ইফতারি তৈরিতে। আযানের আগ মুহুর্তে বাসায় এসে দেখতে পেতাম প্লেটে প্লেটে সাজানো হরেক রকমের ইফতার। ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, আলুর চপ,বেগুনির পাশাপাশি মৌসুমি সব ফল।ছোট বেলায় আমায় সবচেয়ে আকর্ষণ করত রুহ আফজা। লাল টকটকে এই পানীয় আমার খুব পছন্দের ছিল। তারপর কি যে ভালো লাগতো ইফতারি করতে।

যেহেতু আমার বেড়ে ওঠা সরকারি বাসভবনে, আর এখানে একই অফিসের অনেক পরিবারের বাস,তাই সবার সঙ্গে সবারই হৃদ্যতা সম্পর্ক বিরাজমান। এ সম্পর্ক আত্মীয়তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। রোজাতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাসা থেকে খাবার আসতো। আমাদের বাসায়ও একদিন বড় আকারে ইফতারের আয়োজন হতো। সেদিন সবার বাসায় বাসায় ইফতার দেয়া হতো। সেদিন সে কি আনন্দ আমার! মা প্লেট সাজিয়ে দিতেন, আর আমি বাসায় বাসায় পৌঁছে দিতাম। সেদিনের সেই আমি আর বর্তমানে আমার সন্তানদের সাথে যদি তুলনা করি তাহলে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু থাকে না। কারণ যে কাজটা আমরা ছোটবেলায় মহাআনন্দ নিয়ে করেছি আর বর্তমানে একই কাজ আমার ছেলেকে যদি বলি সে কিছুতেই একাজ করতে রাজি না। খুব জোড়াজুড়ির পর যদিও বা রাজি হয় তবে শর্ত জুড়ে দেয় যে, ওয়ান টাইম প্লেট দিতে হবে। ইফতারি দিয়ে প্লেটের জন্য অপেক্ষা করা নাকি খুব অস্বস্তির ব্যাপার। তাই মাঝে মাঝে ভাবি বর্তমান যুগের ছেলে-মেয়েদের ইগো কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর কথা মনে করে বেশ অবাকই লাগে। আহা! কোথায় হাড়িয়ে গেলো আমার সেই নির্মল উচ্ছ্বাসে ভরপুর দিনগুলো।

তারপর রোজার মাঝামাঝি সময়ে আব্বা বোনাস পেলে শুরু হতো ঈদের কেনাকাটা। আব্বা আম্মাকে দেখেছি কেনাকাটার আগে কাগজ কলম নিয়ে হিসেব করতে। আত্মীয় পরিজন সবার জন্যই সামর্থ্য অনুযায়ী কেনাকাটা করতেন। আমাদের ভাই বোনদের নিয়ে আব্বা একদিন মৌচাক মার্কেটে যেতেন, আব্বা তেমন ঘুরাঘুরি পছন্দ করতেন না, দু ‘একটা দোকানে ঢুকতেন, পছন্দ করতেন আর কিনে ফেলতেন। তখনকার দিনে মার্কেট বলতে গাউছিয়া, নিউ মার্কেট আর মৌচাক কেই জানতাম। মনে পরে, জামা, জুতা,চুড়ি, ফিতা, নেলপলিশ, লিপস্টিক কোনো কিছুই বাদ যেতো না।

রোজার শেষের দিকে প্রায় প্রতিদিনই লেসফিতার আগমন ঘটত। দাদীজান তার পুটলি থেকে টাকা বের করে দিতেন আমাদের সাজুগুজুর জিনিস কেনার জন্য। আমরা বোনেরা গোল হয়ে লেসফিতার চারিধারে বসতাম, আর মাকে পাগল করে তুলতাম এটা সেটা কিনে দেয়ার জন্য। কি না থাকতো লেসফিতার ঝুড়িতে-আলতা,স্নো -পাউডার,লিপস্টিক, নেলপলিশ,চুড়ি ফিতা, পরচুলা ইত্যাদি ইত্যাদি।

তারপর আসত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সাতাস রোজার পর আমরা চলে যেতাম গ্রামের বাড়িতে। যেদিন গ্রামে যেতাম সেদিন সেহরি খেয়ে রওনা হতাম। আমরা যখন সোনারগাঁও মেঘনা ঘাটে পৌঁছাতাম, তখন সবে মাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। দোকানপাট তেমন খোলা থাকত না। তবে নদী থেকে তোলা খাড়িভর্তি টাটকা টাটকা নানাপ্রজাতির মাছ নিয়ে জেলেদের দৌড়ঝাপঁ শুরু হতো। নদীর ঘাটে একটা পর একটা মাছ ধরার নৌকা ভীড়ত আর জেলেরা মাছের খাড়ি নামানোর প্রতিযোগিতায় লেগে যেতো। আস্তে আস্তে নদীর ঘাট মাছভর্তি ঝুড়িতে ভরে উঠত।

আমি যেসময়ের কথা বলছি, তখনও গ্রামে যাওয়ার জন্য ইঞ্জিন চালিত নৌকা চালু হয়নি। তাই বৈঠা হাতে পালতোলা নৌকাই ভরসা ছিল। নৌকা আগে থেকেই ঠিক করা থাকত। আমরা নৌকায় উঠে বসতাম, মাঝি বৈঠা হাতে নৌকা ভাসাতেন। ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা এগিয়ে যেতো। সকালের শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ,বৈঠা আর ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ,মাথার উপরে অসংখ্য গাঙচিলের উড়াউড়ি (যেহেতু কিছুক্ষণ আগে মাছধরার নৌকাগুলো ভীড়েছে তাই গাঙচিলের উড়াউড়িও বেড়েছে) মাছধরার নৌকা থেকে ছো মেরে মাছ নেয়ার প্রানান্ত চেষ্টা। এক মহোনীয় মায়াবী পরিবেশের মধ্যদিয়ে আমরা এগিয়ে যেতাম আমাদের নাড়ী পোঁতা সেই আজন্ম শেকড়ের টানে।

এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে খুব করে উপলব্ধি করছি, মানুষের জীবনের সবচাইতে সুন্দর মুহূর্তগুলে শৈশবকে ঘিরে। কোনো চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, বাড়তি চাপ নেই, চেয়েছি তো পেয়েছি। কোথা থেকে আসল,কেমন করে জোগাড় হলো, মা-বাবার কষ্ট হচ্ছে কিনা এগুলো কখনো ভাবনাতে আসেনি।

মাকে দেখেছি সারাদিন ব্যস্ত থেকেছেন তাও আবার হাসিমুখে। নিজের জন্য আলাদা বলে কিছু ছিল না। মা হবার পর বুঝতে পেরেছি মায়েদের আলাদা করে চাওয়ার কিছু নেই। সবাইকে খুশি করার মধ্যেই মায়ের আনন্দ। আসলে মা-বাবার মাথার উপর এতো এতো দায়িত্বের বোঝা থাকে যে, তারা আর নিজেদের নিয়ে ভাববার সুযোগ পান না।

এই পবিত্র মাহে রমজানে মহান রবের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি আল্লাহ আমার দাদীজানকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে স্হান দিন। সকল জীবিত পিতামাতাকে সুস্থতার সহিত, নেক হায়াতের সহিত মানসিক প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিন। আমিন।

 

নাজমা সিরাজী- কবি ও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.