Take a fresh look at your lifestyle.

ঈদ উৎযাপন

44

আমার হাসবেন্ড একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। সেজন্য ওদের ঈদের ছুটি খুব কম। মাত্র তিন দিন। ঈদ কোথায় করবো বিষয়টা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমাদের বাসায় সব সিদ্ধান্ত ছেলেমেয়েদের সাথে আলোচনা করে নেওয়া হয়। যেহেতু ছুটি কম তাই বাসায় ঈদ করার পক্ষে সবাই মত দিলো। কিন্তু আমার মনটা কেমন খচখচ করতে লাগলো। বাসায় ঈদ করা মানে তো আমাকে মজার মজার আইটেম রান্না করতে হবে। ছেলেমেয়েরা কিছু ক্ষণ পর পর খাবে আর মোবাইল নিয়ে যার যার ঘরে বসে থাকবে। আর সাহেব মহাশয় টিভিতে আই পিএল খেলা দেখা নয়তো ঘুম। দুই বছর ঈদে বাড়ি যাই না। আব্বা -মার করুন মুখটা ভেসে উঠলো। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমার মন খারাপ দেখে সাহেব বললো চল বাড়ি যাই। নিজেদের গাড়িতে যাবো জ্যামে পড়লে,তবুও তো ছেলেমেয়েদের সাথে অনেকক্ষণ একসাথে থাকা হবে। এবার ছেলেমেয়েরাও আনন্দচিত্তে রাজি হলো গ্রামে যাবে ঈদ করতে। শর্ত হলো কেউ মোবাইল ধরতে পারবে না বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। সিদ্ধান্ত নিতেই বাসার মধ্যে কেমন ঈদের আমেজ এসে গেল। তাড়াতাড়ি গোছগাছ করা, শেষবারের মতো কেনাকাটা করা, পার্লারে যাওয়া এমন আরো অগণিত কাজ।

২৮ শে রমজান সেহরি খেয়ে সবকিছু গোছগাছ করে রেডি হয়ে আমরা ভোর সাড়ে পাঁচটায় যাত্রা শুরু করলাম। গন্তব্য ফরিদপুর। সিদ্ধান্তমতে প্রথমে আমাদের বাড়ি চাঁদ দেখা গেলে সন্ধ্যার পর শ্বশুরবাড়ি। আমি সবসময়ই শ্বশুরবাড়িতে ঈদ করি।আসা যাওয়ার পথে আমাদের বাড়িতে থাকা হয়। কারণ আমাদের বাড়ি পার হয়ে আরো ১০ কিলোমিটার দূরে আমার শ্বশুরবাড়ি। আমার সবসময় মনে হয় আমি যদি ঈদে শ্বশুরবাড়ি না যাই, তাহলে আমার ছেলে,ছেলের বউ,নাতিনাতনি কেউ আমার কাছে ঈদ করতে আসবে না। যাইহোক ভোরের স্নিগ্ধ নিরিবিলি পরিবেশে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। চারপাশে একটা পবিত্র পবিত্র ভাব। মিষ্টি আলোয় চারপাশের গাছপালা দেখে আমি বিমোহিত হচ্ছিলাম। যাত্রা পথে আমার আবার soft music শুনা অভ্যাস।চলতে চলতে রাস্তার দুইপাশে কৃষ্ণচূড়া, সোনালু,জারুল,স্বর্ণচাপা, রাধাচূড়া, হিজল ফুলের শোভা আমাদের মনকে অন্য রকম ভালো লাগায় ভরিয়ে দিচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পরে দেখি ছেলেমেয়ে দুজনের কানে হেডফোন লাগিয়ে যার যার পছন্দের গান শুনছে। আমি আপত্তি জানালাম এটা হবে না আজ তোমাদের পছন্দের গান আমরা শুনবো। ঈদের সময় ধুমধড়ক্কা গান শুনায় যায়। অবশেষে গান,গল্প, হাসি আনন্দে আমরা ভালোমতোই আমাদের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম।

বাড়িতে যেয়ে আব্বা- মার হাসিভরা মুখটা দেখে যাত্রাপথের সব ক্লান্তি ভুলে গেলাম। আমার আরও দুই ভাই আজ আসার কথা। আমরাই আগে এসে পৌছেছি। একে একে সবাই এসে পৌঁছালো। হাসি,গল্পে আনন্দে বাড়িটা গমগম করছে। আমার চোখ বারেবারে আব্বা – মার আনন্দে উপচে পড়া চোখেমুখে আটকে যাচ্ছে। সবাই মিলে ইফতারি করে নামাজের পর শুরু হলো চা পর্ব। ততক্ষণে জেনে গেছি ঈদের চাঁদ দেখা যায় নি। মনে মনে খুশি হলাম আর একটা দিন বেশি থাকা হবে।থেকে গেলাম বাবার বাড়িতে। এতোক্ষণে মা সব কাজ শেষ করে পানের বাটি নিয়ে বসার সময় পেল। আমি পান খাই না, তবে বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি গেলে সবাইকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য পান খাই। পান খেতে খেতে গল্প করতে বেশ লাগে। এবার এলো ঈদের সবচেয়ে মজার পর্ব – সবার ঈদ মার্কেটিং দেখা, কে কার জন্য কি উপহার এনেছে। আগে আমরা খালাতো,মামাতো ভাইবোনরা একসাথে হলে আমাদের গল্পই শেষ হতো না, হা হা হি হি লেগেই থাকতো। সারারাত জেগে গল্প করতাম। আব্বা শুধু বলতো এখন ঘুমা কালকে গল্প করিস।এখনকার ছেলেমেয়েরা যেন কথা বলতেই ভুলে গেছে। কোনকিছুতে উচ্ছ্বাস নেই, আগ্রহ নেই। সবাই এক বিছানায় মোবাইল হাতে চিৎ কাৎ হয়ে শুয়ে-বসে আছে। ছোটদের কোন কোলাহল নেই। আমাদেরই হাসি আড্ডার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। বেশি রাত পর্যন্ত আড্ডা জমলো না। যার যার মতো ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি। আগে সেহরি খাবার পর থেকে শুরু হয়ে যেত আমার সাহেবের তাড়া দেওয়া। কয়েক বছর হলো আমার শ্বশুর শাশুড়ী মারা গেছেন। তাদের মতো চমৎকার, উদার,ধার্মিক মানুষ আমি কম দেখেছি। আল্লাহ তালা উনাদেরকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন। তাছাড়া বাজার করার একটা তাড়া থাকতো। আমরা এবার একটা কাজ করেছি। বাজার খরচ আর সবার ঈদের কেনাকাটা করার জন্য সবাইকে আলাদাভাবে বিকাশ করে দিয়েছি। সেজন্য আসার তাড়াটা একটু কম ছিল। তবু্ও আমি সকাল সকাল গোসল করে রেডি হয়েছিলাম। ১২টার মধ্যে আমরা শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে গেলাম। কিন্তু কারও জন্য কোন কিছু কেনাকাটা করিনি।কেমন যেন খালি খালি লাগছিল আমাদের কাছে।কিন্তু এসে দেখলাম বাড়ির সবাই এতেই বেশি খুশি হয়েছে যার যার পছন্দমতো জামাকাপড় কিনতে পেরেছে বলে। গ্রামের একটা জিনিস আমাকে খুব মুগ্ধ করতো। যেসব বাচ্চারা শহর থেকে আসতো তারা সবাই সারা গ্রামের মেহমান হতো। তিন চার বাড়ির বাচ্চারা সবসময় একসাথে ঘুরাঘুরি, খেলাধুলা, এক পুকুরে একসাথে গোসল করা। যে কোন এক বাড়িতে সবাই একসাথে খেয়ে নিতো। অনেক রাত পর্যন্ত একসাথে ঘুরাঘুরি করা,দোকানে যাওয়া, বাজি ফাটানো এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। আমার শাশুড়ী যতোদিন বেঁচে ছিল আমরা যতোদিন থাকতাম তার নাতি নাতনীর জন্য প্রতিদিন চিতই পিঠা বানাতো। সব বাচ্চারা খেলাধুলার ফাঁকে ফাঁকে এসে পিঠা খেয়ে যেত। আমি বাড়িতে গেলে বাচ্চাদের একদম ছেড়ে দিতাম। কোনকিছুতে বাঁধা নেই। শুধু কিছুক্ষণ পর পর পানি খেতে দিতাম। আমি শ্বশুরবাড়িতে যতোটা না বউ তারচেয়ে অনেক বেশি মেহমান। সবার কতো রকম কাজ থাকে। আমার একমাত্র কাজ সবার সাথে গল্প করা। বিয়ের পর থেকে এখনো পর্যন্ত একটাই কাজ। সবার সাথে গল্প করা আমি নিষ্ঠার সাথে ভালোবেসে কাজটা করি।

এবার দুই বছর পর গ্রামে এলাম ঈদ করতে। অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ছে। গ্রাম আর অাগের মতো নেই। সবার ঘরে ঘরে রঙিন টিভি ডিসসহ, ফ্রিজ,ফ্যান, স্মার্ট ফোন। কেউ কারও বাড়ি আসে না বা আসার সময় নেই, বাচ্চাদের ও আগের মতো দৌড়াদৌড়ি নেই। সবাই স্মার্ট ফোনে ব্যস্ত, বাজি আর আগের মতো ফুটানো হয় না, ছেলেমেয়েরাও আগের মতো হুটোপুটি করে না। শহরের হাওয়া গ্রামে এসে লেগেছে। কেউ কারো খোঁজ রাখে না। যাইহোক আমাদের বাড়িতে ঈদ জমে উঠেছে। সন্ধ্যার পর থেকেই চলছে হাতে মেহেদী পড়া সঙ্গে হাসি,ঠাট্টা, গল্প, খাওয়া দাওয়া আর বাজি ফাটানো। অনেক রাত পর্যন্ত চললো আড্ডা।

ঈদের সকালে বাড়ির সব ছেলেমেয়ে পুকুরে গোসল করে ছেলেরা মিষ্টি খেয়ে নামাজে চলে গেল। আর মেয়েরা নতুন জামা পড়ে সাজুগুজুতে ব্যস্ত। এদিকে হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। জোরে বাতাস শুরু হলো।একটু পরই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমিও নেমে পড়লাম বৃষ্টিতে গোসল করার জন্য। কতোদিন পর যে বৃষ্টিতে ভিজলাম আমি নিজেই জানি না। ওরাও কোনমতে নামাজ শেষ করে দৌড়ে বাড়িতে পৌঁছালো। তারপর সবাই মিলে খিচুড়ি, সেমাই, পায়েস খেলাম। বৃষ্টি থামার পর আমরা দুজনে গাড়ি নিয়ে বের হলাম ঘুরতে। রাস্তায় যেসব ছেলেমেয়েদের দেখলাম তাদের সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। ঘুরতে ঘুরতে আমরা পদ্মার পাড়ে চলে গেলাম। নতুন স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করছে।কি যে সুন্দর জায়গাটা। সেখানেও একই ঘটনা। সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। ফেরার পথে ননদ,ননদের বর,ওর বাচ্চাদের নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলাম। ফুপুকে পেয়ে ঈদ যেন আরো জমে উঠলো। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সবার হাসি ঠাট্টা গল্প যখন তুঙ্গে। হঠাৎ মনে হলো আমার শ্বশুর শাশুড়ী আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

ঈদের পরের দিন এক ঝাঁক প্রিয় মানুষের তৃপ্ত মুখের ছবি হৃদয়ে ধারণ করে আমরা সবাই আত্মতৃপ্তি নিয়ে নিজ ঠিকানায় ফিরে এলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খচখচানি থেকেই গেল। ভবিষ্যত প্রজন্ম কোন দিকে যাচ্ছে? এরা কি কখনও মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারবে? এদের ভবিষ্যত কি? আমরা বেশি স্মার্ট হতে যে কি ভবিষ্যত প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি না। এখনো সময় আছে ওদেরকে আলোর দিকে ফিরিয়ে আনার।

আসুন সবাই সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে সব লাভ ক্ষতি ভুলে নিজেদের প্রয়োজনে পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করি, আত্মীয়তার সম্পর্কে আরও মজবুত করি।এই সব কোমলমতি ছেলেমেয়েদেরকে ভালোবাসা দিয়ে পারিবারিক বন্ধনে ফিরিয়ে আনি। ওদেরকে ভার্চুয়াল জগৎ থেকে ফিরিয়ে রিয়েল লাইফে সৃজনশীলকাজে উৎসাহ দিই। ওদেরকে বেশি বেশি সময় দেই। ঈদ পার্বণে বা যেকোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে পরিবারের সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক হই। গ্রামের মেঠোপথ, আলপথ দিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান, প্রকৃতির কাছাকাছি যান, আপনার জীবনের মজার মজার স্মৃতি শেয়ার করুন, ভালোবাসায় আগলে রাখুন, আস্হার জায়গা তৈরী করুন। নিজে ভালো থাকুন, অন্যকে ভালো রাখুন।

 

 

ফারহানা জেসমিন মনি-  গল্পকার ও সাহিত্যিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.