Take a fresh look at your lifestyle.

কবি মেলা

185

 

গতকাল ২৫ মার্চ শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে ‘কবি মেলা’ বসেছিলো। অনলাইন সাহিত্য গ্রুপ ‘চেতনায় সাহিত্য’- এর উদ্যোগে খুলনা বিভাগের সাহিত্যিকদের নিয়ে বসেছিলো এই মিলন মেলা। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা অবধি একটানা চলে আবৃত্তি, গান, আলোচন, ঘুরাঘুরি, ছবিতোলা, খাওয়াদাওয়া আর আড্ডা। প্রথম পর্ব কবিগুরুর সান্নিধ্যে আনন্দঘন পরিবেশে শুরু হলেও দ্বিতীয় পর্ব শেষ হয় বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজারে বেদনাবিধুর বিদায়ের মধ্য দিয়ে।

খুলনা থেকে এসেছিলেন গল্পকার ইসরাত জাহান- একটু বেশিই স্পষ্টবাদী মানুষ। কবিদের জন্যে নানান পদের খাবার তিনি সাথে নিয়ে এসেছিলেন নিজের প্রাইভেট গাড়িতে সাজিয়ে। সকালে যে কেক কেটে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ওটি ছিলো তারই সৌজন্যে। বিদায়কালে একটি বাটি থেকে বের করলেন সুমিষ্ট খেজুর। তার আপ্যায়ন যেনো ফুরাবার নয়। যশোর থেকে এসেছিলেন কবি পারভীন আক্তার পারু, যিনি যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের মিষ্টি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তবে সদা হাস্যোজ্জ্বল এই কবির হাসি গুড়ের চেয়ে কিছু কম মিষ্টি ছিলো না। সমাবেশ শেষে আগত কবিদেরকে যে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করা হয় তা ছিলো এই পারু আপার সৌজন্য। তার সদ্য প্রকাশিত ‘কাচের দেয়াল’ কাব্য গ্রন্থটি তিনি অটোগ্রাফসহ সকলকে উপহার দেন। রাজশাহী থেকে কবি মিজান ও রম্য লেখক আব্দুল্লাহ রিফাতকে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ‘কবি মেলা’র প্রধান উদ্যোক্তা ও গ্রুপ এডমিন সুসাহিত্যিক আব্দুল মতিন। নিকটবর্তী না হলে বুঝতাম না একজন মানুষ সাহিত্যের জন্যে কতোটা নিবেদিতপ্রাণ হতে পারেন। মতিন ভাই সারাক্ষণ এ পর্ব সে পর্ব নিয়ে শুধুই ব্যস্ত থাকলেন। আবার ঘনিষ্ঠভাবে সময়ও দিলেন সকলকে। তারই সৌজন্যে উপভোগ্য হয়ে উঠেছিলো দুপুরের খাবার এবং নিজ বাগানের পেয়ারা দিয়ে বিদায় পর্ব। কবি মিজান ছিলেন ক্যামেরা ক্রুর দায়িত্বে। সারাক্ষণ ফটোগ্রাফ আর লাইভ ভিডিও। কবিদের বিশেষ মুহূর্তগুলোও সম্ভবত বাদ পড়েনি তার ক্যামেরার শকুনি নজর থেকে।

খোকসা থেকে জগদীশের মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন আমাদের প্রাণের কবি ওয়াজেদ বাঙালি। মানুষটির বয়স হলেও তারুণ্যে একটুও ভাটা পড়েনি তার। সারাক্ষণ খুনসুটি আর মজার মজার সব গল্প-কবিতা নিয়ে আসর মাতিয়ে রাখার এক আজব কারিগর তিনি। কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে এলেন এ যুগের কাঙাল হরিনাথ খ্যাত এক স্বভাব কবি- নাম তার জসীম উল্লাহ আল হামিদ। অনেকটাই চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ। নিজের গ্রামের বাড়িতে তিনি একটি ছাপাখানা চালাচ্ছেন। বেরিয়েছে তার অনেকগুলো কবিতার বই। বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের সাথে তিনি জড়িত।

আমি আগেও জানতাম কবিদের হৃদয়ের মতো তাদের হাতও খুব নরম হয়ে থাকে। যে হাতে কবিগণ কলম ধরে যুদ্ধ করেন সেই হাতগুলো কাল আবার ছুঁয়ে দেখলাম- খুবই কোমল, পেলব, নমনীয়। কুঠিবাড়িতে এসে কবিগণ গুরুর ছোঁয়ায় আরও যেনো নরম হয়ে উঠলেন। বিকেলে লালনের আধ্যাত্মবাদের স্পর্শে ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়িতে কে যেনো মনে মনে বলে গেলো ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। অন্য যে কোনো দিনের চেয়ে গত কালের দিনটি আকারে ছোট ছিলো- এ কথা উপস্থিত সকল কবি এক বাক্যে স্বীকার করবেন। সন্ধ্যার আগে হৃদয়ের সবগুলো তারে একযোগে বেজে ওঠে বিদায়ের করুন সুর। বিদায় বেলার কালো মেঘে ধুঁয়া হয়ে মিশে গেলো সারাদিনের হাসি আর গান। পাশ ফিরে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত গোপন থাকেনি কারও। ঠাকুর বাড়িতে পারু আপার গাওয়া সেই অবিনাশী গানে আবার আচ্ছন্ন হোলো দেহমন-‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে- – -‘।

 

 

রফিকুল্লাহ- কালবী- কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক( কুষ্টিয়া) 

Leave A Reply

Your email address will not be published.